১০৮

টাকার অঙ্কটি খুব বড় ছিল না, মাত্র ১২০ সৌদি রিয়াল। কিন্তু সেই ঋণের ঋণভার এবং বন্ধুর প্রতি দেওয়া প্রতিশ্রুতি দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে বুকে বয়ে বেরিয়েছেন ভারতের কেরালার বাসিন্দা ইসমাইল। তিন দশকেরও বেশি সময় পর সেই ঋণ শোধ করতে তিনি যা করলেন, তা বর্তমান যুগে সততা, কৃতজ্ঞতা এবং বন্ধুত্বের এক অবিশ্বাস্য ও অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

যেখান থেকে এই বন্ধুত্বের শুরু

ঘটনাটির সূত্রপাত ১৯৯১ সালে। কেরালার ইসমাইল ও তেলেঙ্গানার জাগতিয়াল জেলার ধর্মপুরীর বাসিন্দা এডলা লাচান্না কাজের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবের আবকাইকে গিয়েছিলেন। সেখানে একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুবাদে তাঁদের মধ্যে গভীর আন্তরিকতা ও নিবিড় বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে ব্যক্তিগত জরুরি প্রয়োজনে লাচান্নার কাছ থেকে ১২০ সৌদি রিয়াল ধার নেন ইসমাইল এবং দ্রুত তা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

তবে কিছুদিন পরই লাচান্না স্থায়ীভাবে ভারতে ফিরে আসেন। তৎকালীন সময়ে মোবাইল ফোন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সুবিধা না থাকায় একপর্যায়ে দুই বন্ধুর যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

স্মৃতির সূত্র ধরে বন্ধুর খোঁজ

যোগাযোগের সব পথ বন্ধ হয়ে গেলেও ইসমাইল তাঁর দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভোলেননি। দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে তাঁর অবচেতন মনে বন্ধুর ঋণ শোধ করার তীব্র তাগিদ ছিল। তাঁর কাছে শুধু একটি মাত্র তথ্য ছিল—লাচান্নার বাড়ি তেলেঙ্গানার ‘ধর্মপুরী’ এলাকায়।

সম্প্রতি ইসমাইল কেবল এই সামান্য তথ্যটুকুকে সম্বল করে বন্ধুর খোঁজে নেমে পড়েন। ইন্টারনেটের সহায়তায় প্রথমে শহরটি খুঁজে বের করেন এবং পরবর্তীতে স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর অবশেষে লাচান্নার পরিবারের সন্ধান পান।

২৫ হাজার রুপি ফেরত ও আবেগময় পুনর্মিলন

গত ৯ জুলাই (২০২৬) ইসমাইল সরাসরি লাচান্নার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তাঁর পরিবারের হাতে ২৫ হাজার ভারতীয় রুপি তুলে দেন। সে সময় লাচান্না আবারও কাজের প্রয়োজনে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করায় দুই বন্ধুর সশরীরে দেখা না হলেও, হোয়াটসঅ্যাপ ভিডিও কলের মাধ্যমে তাঁদের আবেগঘন পুনর্মিলন ঘটে। ৩৫ বছর পর বন্ধুকে পর্দায় দেখে দুজনেই কান্নায় ভেঙে পড়েন।

১২০ রিয়ালের (যা বর্তমানে বাংলাদেশি বা ভারতীয় মুদ্রায় ৩-৪ হাজার টাকার সমতুল্য) পরিবর্তে ২৫ হাজার রুপি পেয়ে ভীষণ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন লাচান্না। তিনি বলেন, “আমি জানি না ইসমাইল কীভাবে এই অঙ্কটি হিসাব করেছেন। হয়তো দীর্ঘ সময়ের মূল্যস্ফীতি বা সময়ের মূল্য হিসাব করে তিনি এটি দিয়েছেন। তবে টাকার চেয়েও বড় বিষয় হলো, এত বছর পরও আমার বন্ধু তাঁর দেওয়া কথা রেখেছেন। এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া।”

টাকার চেয়েও বড় সততার মূল্য

ইসমাইলের এই মহৎ উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, সম্পর্কের ক্ষেত্রে টাকার অঙ্কটা কখনো বড় বিষয় নয়; বরং সততা, কৃতজ্ঞতা এবং প্রতিশ্রুতির মূল্যই সবকিছুর ঊর্ধ্বে। তিন দশক আগের একটি সাধারণ প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে ইসমাইল আজ শুধু তাঁর বন্ধুর বুকেই নয়, বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষের হৃদয়ে এক অনুকরণীয় উদাহরণ হয়ে উঠেছেন।