৯৬

সিরিয়ার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ, তার ছোট ভাই মাহের আল-আসাদ এবং সাবেক নিরাপত্তা কর্মকর্তা আতেফ নাজিবকে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) দামেস্কের চতুর্থ ফৌজদারি আদালত এ রায় ঘোষণা করেন।

আদালতের রায়ে বাশার আল-আসাদ ও মাহের আল-আসাদকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তারা বর্তমানে সিরিয়ার বাইরে অবস্থান করছেন। অন্যদিকে, বাশার আল-আসাদের মামাতো ভাই এবং দারার সাবেক রাজনৈতিক নিরাপত্তা প্রধান আতেফ নাজিব আদালতে উপস্থিত ছিলেন এবং তাকেও একই সাজা দেওয়া হয়েছে।

যেসব অভিযোগে সাজা

আদালত বাশার আল-আসাদকে একাধিক হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন, বেআইনি আটক এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্য দোষী সাব্যস্ত করেন। এসব কর্মকাণ্ডকে আদালত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করেছে।

মাহের আল-আসাদ তৎকালীন সিরীয় সেনাবাহিনীর প্রভাবশালী ফোর্থ ডিভিশনের নেতৃত্বে ছিলেন। আদালতের অভিযোগ অনুযায়ী, সাবেক সরকারের নিরাপত্তা ও সামরিক কাঠামোর মাধ্যমে সংঘটিত বিভিন্ন গুরুতর অপরাধের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা ছিল। তাকেও অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

আতেফ নাজিবের বিরুদ্ধে দারায় ২০১১ সালের সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনের সময় হত্যা, নির্যাতন এবং গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়। আদালত তাকে হত্যা, ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ইচ্ছাকৃত হত্যাসহ নির্যাতনের মাধ্যমে মৃত্যুর ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত করেছে।

দারার আন্দোলন ও নাজিবের ভূমিকা

২০১১ সালের মার্চে সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর দারায় সরকারবিরোধী আন্দোলনের সূচনা হয়। ওই আন্দোলন দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপ পরবর্তী সময়ে দেশটিতে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সূত্রপাত ঘটায়। আতেফ নাজিব তখন দারার রাজনৈতিক নিরাপত্তা শাখার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

সিরিয়ার ওই সংঘাত প্রায় ১৪ বছর স্থায়ী হয়। এতে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ নিহত এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আসাদের পতনের পর প্রথম বড় বিচারিক পদক্ষেপ

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিদ্রোহী বাহিনী দামেস্ক দখলের পর বাশার আল-আসাদের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটে। এরপর তিনি ও মাহের আল-আসাদ রাশিয়ায় পালিয়ে যান। নতুন সিরীয় কর্তৃপক্ষ সাবেক সরকারের আমলে সংঘটিত গুরুতর অপরাধের বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়।

আসাদের বিরুদ্ধে এটি পতনের পর প্রথম বড় ধরনের বিচারিক রায়। ফলে রায়টিকে সিরিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য জবাবদিহি ও বিচারপ্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিকভাবে রায় কার্যকরের প্রশ্ন

বাশার ও মাহের আল-আসাদ দেশের বাইরে থাকায় তাদের বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ড বাস্তবে কার্যকর করতে হলে তাদের অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। আদালত পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে অনুসরণের উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়েও পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে।

তবে রায় ঘোষণার পরও এর বাস্তবায়ন এবং আসামিদের হেফাজতে আনা নিয়ে বড় ধরনের আইনি ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়ায় অবস্থানরত বাশার ও মাহের আল-আসাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর নির্ভর করবে।

সিরিয়ার দীর্ঘ সংঘাতের সময় সংঘটিত গুরুতর অপরাধের জন্য দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে এই রায় দেশটির বিচারিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা হয়ে থাকল।