৭২

টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে দেশের সাতটি জেলায় সৃষ্টি হয়েছে এক প্রলয়ংকরী বন্যা পরিস্থিতি। এই দুর্যোগে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাদের জন্য সরকারি বরাদ্দের যে হিসাব সামনে এসেছে, তা নিয়ে এখন দেশজুড়ে তীব্র আলোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রয়োজনের তুলনায় এই নামমাত্র সহায়তায় বন্যাকবলিত একটি পরিবারের টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব।

সরকারি সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের মোট ৫৮টি উপজেলা বন্যায় মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হয়েছে।

প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির সর্বশেষ চিত্র

চলমান এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও ৩৯ জন। বন্যায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ। বর্তমানে ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবার সম্পূর্ণ পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। জীবন বাঁচাতে ১ হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন বিপন্ন মানুষ।

ভৌগোলিক অবস্থান ও পাহাড়ধসের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা। কেবল চট্টগ্রামেই প্রায় ৫ লাখ ৯৫ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অন্যদিকে কক্সবাজারে স্থানীয় বাসিন্দা ও রোহিঙ্গাসহ প্রাণ হারিয়েছেন ২৮ জন।

ত্রাণের অপ্রতুলতা: মাথাপিছু মাত্র ২৮ টাকা ও ৩ কেজি চাল

সরকারি তথ্যমতে, গত ৬ দিনে বন্যাকবলিত এলাকার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা এবং ৩ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে মোট ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যার (১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন) সঙ্গে এই বরাদ্দের হিসাব মেলালে এক চরম বাস্তবতার চিত্র ফুটে ওঠে।

বরাদ্দের পরিসংখ্যান:

  • মাথাপিছু নগদ অর্থ: মাত্র ২৮ টাকা
  • মাথাপিছু খাদ্য সহায়তা: মাত্র ৩ দশমিক ২ কেজি চাল

এই নামমাত্র বরাদ্দ নিয়ে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই। চরম সংকটের মুহূর্তে মাত্র ২৮ টাকা ও ৩ কেজি চাল দিয়ে একটি পরিবারের কয়েকদিনের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানো কীভাবে সম্ভব—তা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমেও ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে।

সরকারের আশ্বাস ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

উদ্ভূত পরিস্থিতির বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চাল ও নগদ অর্থের পাশাপাশি উপদ্রুত এলাকায় শুকনা খাবার এবং ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ির জন্য ঢেউটিন বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রয়োজনে পর্যায়ক্রমে বরাদ্দের পরিমাণ আরও বাড়ানো হবে বলেও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

তবে দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই বন্যা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়, তাহলে শুধু এই সামান্য ত্রাণ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে না। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরপরই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য বড় পরিসরে গৃহনির্মাণ, চিকিৎসাসেবা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পুনর্বাসন কর্মসূচি দ্রুত হাতে নেওয়া জরুরি হয়ে উঠবে।