১৭২

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় চলতি বোরো মৌসুমে সরকারি খাদ্যগুদামে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান ও সিদ্ধ চাল সংগ্রহ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে। খাদ্যশস্য সংগ্রহে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং মধ্যস্বত্বভোগী ও ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্য কমাতে এবার উন্মুক্ত লটারির মাধ্যমে প্রকৃত কৃষক নির্বাচন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সরকারের এই ডিজিটাল ও স্বচ্ছ পদক্ষেপের কারণে স্থানীয় সাধারণ ও প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা এবং স্বস্তি দেখা গেছে।

আজ বৃহস্পতিবার (২১ মে) সকাল ১১টায় উপজেলা পরিষদ সম্মেলন কক্ষে উপজেলা প্রশাসন ও খাদ্য বিভাগের যৌথ আয়োজনে এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। নীলফামারী-১ (ডোমার-ডিমলা) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ আব্দুস সাত্তার প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এই সংগ্রহ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।

প্রকৃত কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের তাগিদ

উদ্বোধনী বক্তব্যে সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ আব্দুস সাত্তার বলেন, “বর্তমান সরকার চায় প্রকৃত কৃষকরা যেন তাদের উৎপাদিত কষ্টের ফসলের ন্যায্যমূল্য সরাসরি পান। মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেট ভারী হওয়া রোধ করতে এবং খাদ্যশস্য সংগ্রহে শতভাগ স্বচ্ছতা আনতে ডিজিটাল পদ্ধতিতে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে আবেদন গ্রহণ শেষে উন্মুক্ত লটারির আয়োজন করা হচ্ছে। এর ফলে প্রান্তিক কৃষকেরা কোনো প্রকার দালাল চক্র ছাড়াই সরাসরি সরকারি গুদামে ধান বিক্রির সুযোগ পাচ্ছেন।”

তিনি আরও বলেন, কৃষকদের হয়রানিমুক্ত পরিবেশে ধান সংগ্রহ নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন ও খাদ্য বিভাগ সমন্বিতভাবে কাজ করছে। ধানের গুণগত মান যাচাই, ওজন প্রক্রিয়া এবং ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধে যেন কোনো ধরণের অনিয়ম বা দুর্নীতির ছোঁয়া না লাগে, সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখা হয়েছে।

ধান ও চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা এবং মূল্য

উপজেলা খাদ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে কৃষকদের কাছ থেকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও আধুনিক পদ্ধতিতে ধান সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ বছর ডিমলা উপজেলা খাদ্যগুদামে প্রতি কেজি ধান ৩৬ টাকা দরে (১ হাজার ৪৪০ টাকা মণ) মোট ১ হাজার ২০৮ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় মিলারদের কাছ থেকে প্রতি কেজি সিদ্ধ চাল ৪৯ টাকা দরে মোট ১ হাজার ৪৭০ মেট্রিক টন চাল সংগ্রহ করা হবে। উদ্বোধনের প্রথম দিন থেকেই কৃষকদের কাছ থেকে নির্ধারিত মূল্যে ধান ও সিদ্ধ চাল গ্রহণ শুরু হয়েছে।

খাদ্য বিভাগ জানায়, লটারির মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত কৃষকদের তালিকা ইতিমধ্যেই ইউনিয়ন পর্যায়ের কৃষি অফিসের নোটিশ বোর্ডে ও প্রকাশ্য স্থানে টানিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তালিকাভুক্ত কৃষকরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরাসরি সরকারি খাদ্যগুদামে তাদের ধান সরবরাহ করতে পারবেন।

অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতি

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরানুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন— সহকারী কমিশনার (ভূমি) রওশন কবির, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মীর হাসান আল বান্না, উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মামুনুর রশিদ এবং খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসিএলএসডি) নবাব আলী।

এছাড়াও রাজনৈতিক ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির উপদেষ্টা অধ্যাপক রইসুল আলম চৌধুরী, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য গোলাম রব্বানী প্রধান, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর উপজেলা আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, সেক্রেটারি রোকনুজ্জামান বকুল, উপজেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি আরিফুল ইসলাম লিটন এবং ডিমলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শওকত আলী সরকারসহ বিভিন্ন দপ্তরের সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী ও প্রগতিশীল কৃষক প্রতিনিধিরা।

কৃষকদের স্বস্তি ও প্রশাসনের কঠোর বার্তা

উন্মুক্ত লটারির মাধ্যমে কৃষক নির্বাচন করায় সাধারণ কৃষকদের মাঝে ব্যাপক সন্তুষ্টি দেখা গেছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত একাধিক প্রান্তিক কৃষক জানান, অতীতে সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করতে গেলে নানা সিন্ডিকেট ও রাজনৈতিক প্রভাবের মুখে পড়তে হতো। কিন্তু এবার প্রকাশ্য লটারির কারণে প্রকৃত কৃষকরাই সরাসরি সুযোগ পাচ্ছেন, যা প্রশাসনের ওপর কৃষকদের আস্থা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।

অনুষ্ঠান শেষে সমাপনী বক্তব্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরানুজ্জামান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কঠোর নির্দেশ দিয়ে বলেন, ধান সংগ্রহের সময় আর্দ্রতা ও গুণগত মান বজায় রাখতে হবে। গুদামে আসা কোনো কৃষক যেন বিন্দুমাত্র হয়রানি বা সময়ক্ষেপণের শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রাখবে।