৩১২

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জলপথ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় আশঙ্কা তৈরি হয়েছে—বিশ্ব হয়তো ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের চেয়েও বড় বিপদের দিকে এগোচ্ছে। নৌপরিবহন বিশেষজ্ঞ ও মায়ের্সকের সাবেক পরিচালক লার্স জেনসেন বিবিসিকে জানিয়েছেন, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের প্রভাব অতীতের সেই সংকটের তুলনায় আরও গুরুতর হতে পারে।

এই উদ্বেগের প্রতিফলন দেখা গেছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) পরিচালক ফাতিহ বিরোলের বক্তব্যেও। তিনি সতর্ক করে বলেন, বিশ্ব বর্তমানে ইতিহাসের অন্যতম বড় জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে রয়েছে—যা ১৯৭০-এর দশকের তেলের দামের ধাক্কাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটে কী হয়েছিল

জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকট ছিল মূলত একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল। ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় ইসরায়েলকে সমর্থন করায় যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশের ওপর তেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয় আরব দেশগুলো। একই সঙ্গে ইচ্ছাকৃতভাবে তেল উৎপাদনও কমিয়ে দেওয়া হয়।

এর ফলে কয়েক মাসের মধ্যেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রায় চার গুণ বেড়ে যায়। বহু দেশে জ্বালানি রেশনিং চালু হয় এবং শুরু হয় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা। তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যায়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো খরচ কমাতে বাধ্য হয় এবং বেকারত্ব বাড়তে থাকে।

এই সংকটের প্রভাব এতটাই গভীর ছিল যে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে দীর্ঘমেয়াদি মন্দা দেখা দেয় এবং সামাজিক অস্থিরতা, ধর্মঘট ও দারিদ্র্য বেড়ে যায়।

বর্তমান পরিস্থিতি

বর্তমানে ইরানকে ঘিরে সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এই পথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। ফলে সরবরাহ কমে গিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, কিছুদিন আগেও উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে রওনা হওয়া তেল বিশ্ববাজারে পৌঁছাচ্ছিল, তবে পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সরবরাহ আরও কমে যাবে। এতে জ্বালানি ব্যয়ের চাপ শুধু বর্তমানেই নয়, ভবিষ্যতেও দীর্ঘ সময় ধরে থাকতে পারে।

বর্তমান সংকট কি আরও ভয়াবহ হতে পারে?

বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, আজকের বিশ্ব ১৯৭০-এর দশকের তুলনায় বেশি প্রস্তুত। এখন তেলের উৎস বৈচিত্র্যময়, অনেক দেশের কাছে মজুদ রয়েছে এবং জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমেছে।

তবে অন্য বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকটের বড় ঝুঁকি হলো—এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করছে, যাদের অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা তুলনামূলক দুর্বল।

সব মিলিয়ে, পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হবে তা নির্ভর করছে সংঘাত কত দ্রুত শেষ হয় তার ওপর। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত স্থিতিশীলতা ফিরে না এলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে।