১৯১

কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার শশীদল রেলষ্টেশনে ভারতীয় চোরাই পণ্য ও মাদক পাচারের দৃশ্য ভিডিও করতে গিয়ে দুই সাংবাদিক বর্বরোচিত হামলার শিকার হয়েছেন। এ সময় মাদক কারবারিরা তাঁদের পিটিয়ে গুরুতর আহত করে মুঠোফোন ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত মঙ্গলবার (১৯ মে) রাত সাড়ে ১০টার দিকে শশীদল রেলষ্টেশনে এই ঘটনা ঘটে।

এই হামলার ঘটনায় গত বুধবার (২০ মে) বিকেলে শশীদল এলাকায় অভিযান চালিয়ে মো. কবির হোসেন (৩৫) নামে চিহ্নিত এক চোরাকারবারিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার কবির দক্ষিণ শশীদল গ্রামের হোসেন মিয়ার ছেলে।

হামলায় আহত সাংবাদিকরা হলেন— জাতীয় দৈনিক ‘কালের কণ্ঠ’-এর বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া প্রতিনিধি আক্কাস আল মাহমুদ (হৃদয়) এবং ‘কুমিল্লা প্রতিদিন’ পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মো. শরিফুল ইসলাম (সুমন)। তাঁরা বর্তমানে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

ভিডিও ধারণ করতেই অতর্কিত হামলা ও লুটপাট

থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগ ও ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার রাতে চট্টগ্রামগামী আন্তঃনগর ‘চট্টলা এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি শশীদল স্টেশনে পৌঁছালে চোরাকারবারিদের একটি বিশাল দল ভারতীয় অবৈধ মালামাল ও মাদকদ্রব্য বগিতে তোলা শুরু করে। এ সময় চোরাচালানের কারণে সাধারণ যাত্রীরা ট্রেনে উঠতে পারছিলেন না। এই অনিয়মের দৃশ্য সাংবাদিকরা মুঠোফোনে ধারণ করতে গেলে চিহ্নিত চোরাকারবারি কবির হোসেন, পারুল আক্তার ও রাসেলসহ ১২–১৪ জনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র সাংবাদিকদের ওপর লাঠিসোঁটা নিয়ে অতর্কিত হামলা চালায়।

একপর্যায়ে সাংবাদিকরা নিজেদের রক্ষার্থে মোটরসাইকেলে করে স্থান ত্যাগের চেষ্টা করলে স্টেশনের বাইরে প্রধান সড়কে তাঁদের গতি রোধ করে আবারও নৃশংসভাবে মারধর করা হয়। পরবর্তীতে এই নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করলে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে হামলাকারীরা সাংবাদিকদের ব্যবহৃত মুঠোফোন ও পকেটে থাকা নগদ টাকা ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়।

বিজিবি ক্যাম্পের ১০০ গজে সিন্ডিকেট, আঁধারের নাটক!

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, শশীদল বিজিবি (বিওপি) ক্যাম্পের মাত্র ১০০ গজ দূরে অবস্থিত এই রেলস্টেশনটি দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে ভারতীয় চোরাই পণ্য, শাড়ি, কসমেটিকস ও বিপুল পরিমাণ মাদক পাচার হয়ে আসছে। কয়েকটি সংঘবদ্ধ চক্র প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে সীমান্ত এলাকা থেকে অবৈধ মালামাল এনে ট্রেনযোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার করে।

অভিযোগ রয়েছে, চট্টলা এক্সপ্রেস বা অন্য কোনো ট্রেন স্টেশনে প্রবেশের সাথে সাথেই রহস্যজনকভাবে স্টেশনের বিদ্যুৎ চলে যায় এবং চোরাকারবারিদের মালামাল ওঠানো শেষ করে ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার পর আবার বিদ্যুৎ ফিরে আসে। এই অন্ধকারের সুযোগেই মূলত সিন্ডিকেটটি নিরাপদে কাজ সারে।

ভুক্তভোগী সাংবাদিক আক্কাস আল মাহমুদ অভিযোগ করে বলেন, “আমরা দীর্ঘদিনের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে স্পট রিপোর্টিংয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু ভিডিও করার সময় আমাদের ওপর হামলা করা হয়। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, ঘটনার পরপরই আমরা যখন বিষয়টি জানাতে শশীদল বিওপি ক্যাম্পে যাই, তখন দেখতে পাই ক্যাম্প কমান্ডার স্বয়ং হামলাকারী চোরাকারবারিদের সাথে অবস্থান করছিলেন এবং তিনি আমাদের দেখেও কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।”

স্টেশন মাস্টারের উদ্বেগ ও ওসির বক্তব্য

শশীদল রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার আবু তাহের সরকার ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে সাংবাদিকদের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা জানান। তিনি বলেন, “চোরাকারবারিদের দৌরাত্ম্যের কারণে পুরো স্টেশনে মারাত্মক নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে এবং সাধারণ যাত্রীদের ওঠানামায় চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। আমরা এর স্থায়ী সমাধান ও জড়িতদের কঠোর বিচার চাই।”

উল্লেখ্য, সম্প্রতি স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. জসীম উদ্দিন মাদক ও চোরাচালানের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করে সীমান্ত এলাকায় ব্যাপক কড়াকড়ি আরোপ করলেও আসন্ন কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে পাচারকারীদের তৎপরতা দ্বিগুণ বেড়েছে।

ব্রাহ্মণপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফারুক হোসেন জানান, “সাংবাদিকদের ওপর হামলার সুনির্দিষ্ট অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। ইতিমধ্যেই মামলা গ্রহণের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং এজাহারনামীয় আসামি কবিরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনার সাথে জড়িত পারুল ও রাসেলসহ বাকি অপরাধীদের আটকে পুলিশের বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”