৭৬

মাদ্রাসায় যৌন নিপীড়নের মতো ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ শায়খ আহমাদুল্লাহ। আবাসিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নানাবিধ অনাচারের ঘটনা ঘটার কথা নির্দ্বিধায় স্বীকার করে এই সংকট দূর করতে ‘হাইয়াতুল উলিয়া’র পক্ষ থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত ও মনিটরিং কমিশন গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।

গত শনিবার (২৩ ২৩ মে) বিকেল ৬টার দিকে নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি এসব কথা বলেন। বর্তমানে হজের সফরে সৌদি আরবে অবস্থান করায় বিষয়টি নিয়ে তাৎক্ষণিক বিস্তারিত বলতে না পারলেও, দেশে ফিরে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনার কথা জানান এই আলেম।

অপরাধী মাদ্রাসার হোক বা বাইরের—দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে

ফেসবুক পোস্টের মন্তব্য ঘরে (কমেন্ট সেকশনে) শায়খ আহমাদুল্লাহ সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ট্রাজেডির কথা উল্লেখ করে লেখেন, “শিশু রামিসার নৃশংস ঘটনা নিয়ে আলোচনা যখন তুঙ্গে, আমি তখন হজের সফরের উদ্দেশ্যে ঢাকা এয়ারপোর্টে। এয়ারপোর্টে থাকা অবস্থায়ই এ নিয়ে সংক্ষিপ্ত পোস্ট করি। এর কিছুক্ষণ পর যখন বনশ্রী মাদ্রাসার আরেক ট্রাজেডির নিউজ ছড়িয়ে পড়ে, তখন আমি মাঝ আকাশে নেটওয়ার্কের বাইরে। তবে আমি অনেক আগে থেকেই বলে আসছি, ধর্ষক মাদ্রাসার হোক কিংবা মাদ্রাসার বাইরে—তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে শাস্তি কার্যকর করতে হবে।”

আবাসিক মাদ্রাসায় যৌন-অনাচার কমবেশি থাকার সত্যতা স্বীকার করে তিনি আরও বলেন, “এটা অস্বীকারের কোনো সুযোগ নেই। আমরা যদি এ বিষয়ে নীরব থাকি বা উপেক্ষা করি, তাহলে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং সমস্যা আরও বাড়বে। আর এ কারণেই নানা সময়ে এই অনাচার বন্ধে আমি লেখালেখি করেছি।”

২০১৯ সালের সুনির্দিষ্ট সুপারিশমালা স্মরণ

মাদ্রাসার অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিরাপদ করতে ২০১৯ সালে নিজের দেওয়া কিছু লিখিত সুপারিশের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বেশ কয়েকটি বাস্তবমুখী পরামর্শ পুনরুল্লেখ করেন:

  • মাদ্রাসার প্রতিটি কক্ষ সিসি (CC) ক্যামেরার আওতায় আনা।
  • শিক্ষকদের যথাযথ আধুনিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ প্রদান।
  • আবাসিক শিক্ষকদের জন্য ফ্যামিলি বাসা ও নিয়মতান্ত্রিক ছুটির ব্যবস্থা করা।
  • মাদ্রাসার শ্রেণিকক্ষ এবং আবাসন (হোস্টেল) একই সাথে বা সংলগ্ন না রাখা।
  • শিক্ষার্থীদের ঢালাও বিছানার (এক ঢালাও বিছানায় ঘুমানো) পদ্ধতি বন্ধ করে পৃথক খাটের ব্যবস্থা করা।
  • মহিলা মাদ্রাসায় কোনোভাবেই পুরুষ শিক্ষক ও পুরুষ স্টাফ নিয়োগ না দেওয়া।

প্রমিনেন্ট মাদ্রাসায় ঘটনা কম, ছোট ও অনিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানেই ঝুঁকি বেশি

শায়খ আহমাদুল্লাহ তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেন যে, দেশের প্রমিনেন্ট এবং বড় বড় মূল ধারার মাদ্রাসায় এ ধরনের অভিযোগ তেমন একটা শোনা যায় না। মূলত মূল স্রোতের বাইরে কিন্ডারগার্টেনের মতো অনিয়ন্ত্রিতভাবে গড়ে ওঠা ছোট ছোট মাদ্রাসাতেই এই ধরনের ঘটনার আধিক্য দেখা যায়।

তবে ঘটনার সত্যতার পাশাপাশি তিনি মিডিয়ার অতি রঞ্জিতকরণ ও ষড়যন্ত্রের দিকটিও তুলে ধরেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি ফেনীর সাম্প্রতিক একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন, যেখানে এক কিশোরীকে ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ থেকে মুক্ত হয়েছেন স্থানীয় এক ইমাম। পরে ফরেনসিক ও ডিএনএ (DNA) পরীক্ষায় প্রমাণিত হয় যে, শিশুটির বাবা ওই ইমাম নন, বরং কিশোরীর আপন বড় ভাই। শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, আবাসিক প্রতিষ্ঠানে বলাৎকারের ঘটনা যেমন সত্য, অনেক ক্ষেত্রে মিডিয়া সত্যের সাথে মিথ্যার রং মাখায় এবং অন্যকে রক্ষা করতে দুর্বল আলেমদের ফাঁসানো হয়—সেটাও সত্য।

হাইয়াতুল উলিয়ার অধীনে কমিশন গঠনের জোরালো প্রস্তাব

অনাকাঙ্ক্ষিত এই অপরাধ ও ষড়যন্ত্র রুখতে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার সর্বোচ্চ বোর্ড ‘আল-হাইয়াতুল উলিয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’-এর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “বোর্ডের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আলেম ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে এক্সপার্টদের (বিশেষজ্ঞ) নিয়ে একটি শক্তিশালী কমিশন গঠন করা দরকার। যেখানেই এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া যাবে, এই কমিশন দ্রুত সেখানে ছুটে যাবে এবং সরেজমিন নিরপেক্ষ তদন্ত করবে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “তদন্তে অপরাধ সত্য প্রমাণিত হলে অপরাধীকে কঠোর আইনি বিচারের মুখোমুখি করার পাশাপাশি সে যেন ভবিষ্যতে দেশের আর কোনো মাদ্রাসায় চাকরি নিতে না পারে, সেজন্য তাকে ‘ব্ল্যাকলিস্ট’ (কালো তালিকাভুক্ত) করতে হবে। আর যদি ঘটনা মিথ্যা বা ষড়যন্ত্র হয়, সেটাও সংবাদ সম্মেলন করে জাতির সামনে পরিষ্কার করতে হবে। এতে কোনটা বাস্তব আর কোনটা আলেমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র—সেটা সবার সামনে স্পষ্ট হবে।”

সবশেষে শায়খ আহমাদুল্লাহ সতর্ক করে বলেন, বর্তমানে দেশজুড়ে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার যে ভাবমূর্তির সংকট তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে এবং জনসাধারণের আস্থা অটুট রাখতে এই ধরনের সংস্কারমূলক উদ্যোগ এখন অনিবার্য। দ্বীনের দুর্গ হিসেবে পরিচিত এ দেশের মাদ্রাসা-ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা যদি এখনো উদাসীন থাকি, তবে তা আমাদের সবার জন্য সর্বনাশের কারণ হতে পারে।”