৩১

একটি সড়ক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই তছনছ করে দিল নওগাঁর মান্দা উপজেলার পাকুরিয়া নিচপাড়া গ্রামের এক অভাবী পরিবারের স্বপ্ন। টাঙ্গাইলে পণ্যবাহী ট্রাক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন দুই সহোদর—মাইনুল ইসলাম (২৭) ও গিয়াসউদ্দিন (২২)। আজ বুধবার (০৩ জুন) সকালে জানাজা শেষে নিজস্ব জমি না থাকায় স্থানীয় সরকারি কবরস্থানে তাঁদের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। দুই সন্তানের নিথর দেহ গ্রামে পৌঁছালে পুরো এলাকায় শোকের মাতম শুরু হয়।

পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস ছিলেন দুই ভাই

নিহত দুই ভাই ছিলেন শারীরিক প্রতিবন্ধী বাবা আব্দুর রশিদ ও মা জাইরুন বেগমের একমাত্র অবলম্বন। চরম অর্থকষ্টের সংসারে মাইনুল ও গিয়াসউদ্দিন ভাঙারি, পুরোনো মোবাইল ও চুল কেনাবেচার কাজ করতেন। এছাড়া ফেরি করে প্লাস্টিক ও কসমেটিকস সামগ্রী বিক্রি করে যা আয় হতো, তা দিয়েই কোনোমতে চলত তাঁদের সংসার। এই দুই তরুণের অক্লান্ত পরিশ্রমে পরিবারটি ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছিল।

অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ও অবুঝ শিশুর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

বড় ভাই মাইনুল ইসলামের পরিবারে চলছে আহাজারি। তাঁর সাত বছরের একটি শিশুপুত্র রয়েছে এবং স্ত্রী বর্তমানে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। স্বামীর অকাল মৃত্যুর খবর শুনে মাইনুলের স্ত্রী বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। অনাগত সন্তান পৃথিবীর আলো দেখার আগেই তার বাবাকে হারানোর এই নিষ্ঠুর বাস্তবতা মেনে নিতে পারছে না কেউ। স্বজনদের কান্নায় ওই বাড়ির আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।

বিয়ের পিঁড়িতে বসা হলো না গিয়াসউদ্দিনের

ছোট ভাই গিয়াসউদ্দিনকে নিয়ে পরিবারের অন্যরকম পরিকল্পনা ছিল। আসন্ন ঈদুল আজহার পরই তাঁর বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হয়েছিল। পাত্রী দেখা থেকে শুরু করে বিয়ের প্রাথমিক সব প্রস্তুতিও প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। কিন্তু নিয়তির পরিহাসে বিয়ের সানাই বাজার আগেই গিয়াসউদ্দিন ফিরলেন সাদা কাফনে মোড়ানো লাশে।

নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল একটি পরিবার

সবচেয়ে করুণ দৃশ্য ফুটে ওঠে দাফনের সময়। অভাবের সংসারে মাথা গোঁজার ঠাঁই থাকলেও নিজস্ব কোনো আবাদী জমি বা পারিবারিক গোরস্তান নেই তাঁদের। ফলে দুই ভাইকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়েছে সরকারি কবরস্থানে। দুই উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে প্রতিবন্ধী বাবা-মা এখন পুরোপুরি দিশেহারা।

অপেক্ষায় একরাশ প্রশ্ন

পাকুরিয়ার নিচপাড়া গ্রামের বাসিন্দাদের মনে এখন একটাই দীর্ঘশ্বাস—এই নিস্ব ও প্রতিবন্ধী দম্পতির দেখাশোনা এখন কে করবে? মাইনুলের সাত বছরের শিশু আর গর্ভে থাকা অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ কী হবে? শুধু তাই নয়, অভাবের কারণে নেওয়া ঋণের বোঝাই বা এই পরিবারটি কীভাবে সামাল দেবে?

একটি দুর্ঘটনা শুধু দুই ভাইয়ের প্রাণই কেড়ে নেয়নি, একটি পরিবারকে পুরোপুরি অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছে। স্থানীয়রা এই অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর জন্য বিত্তবান ও প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন।