৪২

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনাকর ভূরাজনীতি ও ক্রমবর্ধমান ড্রোনের ঝুঁকি মোকাবিলায় নিজেদের কৌশলগত অবকাঠামো সুরক্ষায় নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও আঞ্চলিক শত্রুদের সম্ভাব্য ড্রোন হামলা রুখতে দেশটির প্রধান প্রধান জ্বালানি ও তেলের ডিপোগুলোর ওপর বিশেষ নকশার ‘লোহার খাঁচা’ (Metal Cages) বা প্রতিরক্ষামূলক ক্যানোপি স্থাপন করছে মধ্যপ্রাচ্যের এই ধনী দেশটি।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সস্তা অথচ নিখুঁত নিশানার ‘কামিকাজে’ বা আত্মঘাতী ড্রোনের ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এই প্রযুক্তির হাত থেকে নিজেদের বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক অবকাঠামো রক্ষা করতেই আমিরাত এই সাশ্রয়ী ও কার্যকর যান্ত্রিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলছে।

রাশিয়ান কৌশলে আমিরাতের ড্রোন প্রতিরোধ

সামরিক বিশেষজ্ঞরা একে ‘কোপ কেজ’ (Cope Cage) বা ড্রোন-বিরোধী নেটவর্ক হিসেবে অভিহিত করছেন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ বাহিনী তাদের ট্যাংক ও সামরিক যানের ওপর যেভাবে ড্রোন হামলা ঠেকাতে লোহার জাল বা খাঁচা ব্যবহার শুরু করেছিল, আমিরাত ঠিক একই কৌশল কিছুটা বড় পরিসরে তাদের স্থায়ী স্থাপনায় ব্যবহার করছে।

তেল ও জ্বালানি ডিপোর ওপর বসানো এই লোহার খাঁচাগুলোর কাজ হলো—উপর থেকে ধেয়ে আসা কোনো বিস্ফোরকবাহী বা আত্মঘাতী ড্রোন সরাসরি মূল তেলের ট্যাংকে আঘাত করার আগেই সেটিকে মাঝপথে আটকে দেওয়া বা বাতাসেই বিস্ফোরণ ঘটানো। এর ফলে ড্রোনের মূল ধাক্কা বা উত্তাপ লোহার খাঁচাটি শুষে নেয় এবং ভেতরের মূল জ্বালানি ট্যাংকারটি বড় ধরণের বিপর্যয় বা অগ্নিকাণ্ড থেকে রক্ষা পায়।

কেন এই বাড়তি সতর্কতা?

গত কয়েক বছরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন তেল শোধনাগার এবং বাণিজ্যিক জাহাজে বেশ কয়েকটি বড় ধরণের ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী এবং ইরাক ও সিরিয়াভিত্তিক বিভিন্ন ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে দূরপাল্লার হামলার সক্ষমতা অর্জন করেছে। অতীতে সৌদি আরবের ‘আরামকো’ এবং খোদ আমিরাতের আবুধাবিতে ড্রোন হামলার তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে।

যদিও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে আমেরিকার তৈরি ‘থাড’ (THAAD) কিংবা প্যাট্রিয়টের মতো বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক ও ব্যয়বহুল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে, তবুও একটি সস্তা ড্রোনের পেছনে লাখ ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয়। তাছাড়া, রাডারকে ফাঁকি দিয়ে নিচ দিয়ে উড়ে আসা ছোট ছোট ড্রোনের ক্ষেত্রে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কখনো কখনো শতভাগ সফল হয় না। সেই শূন্যতা পূরণ করতেই এই ধাতব খাঁচার প্রলেপ দেওয়া হচ্ছে।

অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের চেষ্টা

বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদনকারী ও বাণিজ্যিক হাব হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্বালানি খাতের ওপর পুরো দেশের অর্থনীতি নির্ভরশীল। দুবাই ও আবুধাবির কড়া নিরাপত্তার মধ্যেও তেল সরবরাহ ব্যবস্থা যাতে বিন্দুমাত্র বিঘ্নিত না হয়, সে লক্ষ্যেই এই প্রজেক্ট হাতে নেওয়া হয়েছে।

ইতিমধ্যেই দেশটির বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় পোর্ট এবং মরুভূমির ভেতরের প্রধান তেল মজুত কেন্দ্রগুলোতে এই লোহার খাঁচা বসানোর কাজ শুরু হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে আমিরাতের এই উদ্যোগ অন্যান্য দেশের জন্যেও নিজেদের সুরক্ষার একটি নতুন মডেল হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সামরিক পর্যবেক্ষকরা।