৬১

টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল উপজেলার দেউলাবাড়ি এলাকায় এক প্রবীণ নারীকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা এবং পরবর্তীতে লাশ কূপে ফেলে গুম করার ঘটনায় জড়িত মূল আসামি মো. সাইফুল ইসলামকে (২৫) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারের পর বিজ্ঞ আদালতে হাজির করা হলে সে ভিকটিম আনোয়ারা বেগমকে (৬৫) নৃশংসভাবে হত্যা ও বিকৃত লালসা চরিতার্থ করার কথা স্বীকার করে লোমহর্ষক জবানবন্দি দিয়েছে।

এর আগে উপজেলার দেউলাবাড়ি এলাকার একটি নির্জন বাঁশঝাড় সংলগ্ন পরিত্যক্ত কূপের ভেতর থেকে অর্ধনগ্ন ও ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় আনোয়ারা বেগমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি জেলাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে।

রহস্যজনক নিখোঁজ ও লাশ উদ্ধার

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে দেউলাবাড়ি এলাকায় নিজ বাড়িতে একাই বসবাস করতেন আনোয়ারা বেগম। ছেলে-মেয়েরা অন্য জায়গায় থাকলেও মায়ের সঙ্গে তাদের নিয়মিত যোগাযোগ ও খোঁজখবর ছিল। ঘটনার আগের দিন পর্যন্ত মায়ের সঙ্গে সন্তানদের স্বাভাবিক কথা হয়। তবে পরদিন সকাল থেকে মায়ের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি বন্ধ পেয়ে সন্তানদের মনে সন্দেহের দানা বাঁধে।

আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরা চারপাশে খোঁজাখুঁজি করে তার কোনো সন্ধান না পেয়ে ঘাটাইল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরবর্তীতে অনুসন্ধানের একপর্যায়ে বাড়ির অদূরে একটি নির্জন বাঁশঝাড়ের পরিত্যক্ত কূপে জঙ্গল ও কাপড় দিয়ে ঢাকা অবস্থায় আনোয়ারা বেগমের অর্ধনগ্ন মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ঘাতক গ্রেপ্তার

হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই ঘাটাইল থানা পুলিশ ঘটনাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্তে নামে। স্থানীয়দের জিজ্ঞাসাবাদ, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং সংগৃহীত আলামত বিশ্লেষণ করে মো. সাইফুল ইসলামকে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা হয়। ঘটনার পর থেকেই সাইফুল এলাকা ছেড়ে পলাতক ছিল।

অবশেষে টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপারের দিকনির্দেশনা ও গোপালপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ঘাটাইল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মোকছেদুর রহমানের নেতৃত্বে একটি চৌকস টিম গঠন করা হয়। ওই টিমের সদস্য এসআই মো. রাজু আহমেদ, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই নাজিম উদ্দিন ও এএসআই আমিনুল তথ্যপ্রযুক্তির ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে গত ২২ মে (শুক্রবার) রাত আনুমানিক ১টা ২৫ মিনিটে ঘাটাইল থানা এলাকা থেকেই ঘাতক সাইফুলকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হন।

আসামির জবানবন্দিতে উঠে আসা সেই লোমহর্ষক রাত

পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ ও পরবর্তীতে আদালতে দেওয়া আসামির জবানবন্দি থেকে জানা যায়, ঘটনার দিন সকালে সাইফুল আনোয়ারা বেগমের বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ভিকটিম তাকে ঘরের পাশের গাছের ডাল কেটে দেওয়ার অনুরোধ করেন। সাইফুল গাছে উঠে ডাল কাটার একপর্যায়ে ঘরের ভেতর আনোয়ারা বেগমকে অসাবধানতাবশত কাপড় পরিবর্তন করতে দেখে কু-মতলব আঁটে।

সে দ্রুত গাছ থেকে নেমে ঘরের ভেতর প্রবেশ করে আনোয়ারা বেগমের ওপর চড়াও হয়। ভিকটিম আত্মরক্ষার্থে ধস্তাধস্তি শুরু করলে সাইফুল গামছা দিয়ে তাঁর গলা পেঁচিয়ে মাটিতে ফেলে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। এরপর তাকে টেনে রান্নাঘরে নিয়ে গিয়ে পুনরায় পাশবিক নির্যাতন চালায় এবং মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য মুখে বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। ঘটনা ধামাচাপা দিতে সে লাশটি প্রথমে ডালপালা দিয়ে ঢেকে রাখে এবং ভিকটিমের কানের দুল খুলে নিয়ে পালিয়ে যায়।

লোমহর্ষক বিষয় হলো, ওই দিন রাত গভীর হলে সাইফুল পুনরায় ঘটনাস্থলে ফিরে আসে। ডালপালা সরিয়ে মৃতদেহের ওপর আবারও বিকৃত যৌন লালসা চরিতার্থ করে সে। এরপর লাশটি টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে পাশের একটি নির্জন বাঁশঝাড়ের পরিত্যক্ত কূপের ভেতর ফেলে দেয় এবং উপর থেকে কাপড় ও জঙ্গল ছুড়ে মেরে ঘটনাটি আড়াল করার চেষ্টা করে।

আইনি প্রক্রিয়া চলমান

ঘাটাইল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মোকছেদুর রহমান জানান, “হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই পুলিশ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তদন্ত এগিয়ে নেয়। গ্রেপ্তারকৃত আসামির বিরুদ্ধে প্রাথমিক তদন্তে এবং পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণে ঘটনার শতভাগ সত্যতা পাওয়া গেছে। আসামিকে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হলে সে ১৬৪ ধারায় নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। এই জঘন্যতম অপরাধের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া দ্রুততম সময়ে শেষ করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে।”