৭৬

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর গলা কেটে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। রায়ে মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্নাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে প্রধান আসামি সোহেলকে ৫ লাখ টাকা এবং তাঁর স্ত্রী স্বপ্নাকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

আজ রোববার (৭ জুন) বেলা ১১টা ৩৮ মিনিটে ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালত জনাকীর্ণ আদালতে আসামিদের উপস্থিতিতে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

দেশের বিচারিক ইতিহাসে অবকাশকালীন ছুটি বাতিল করে এত দ্রুততম সময়ে কোনো হত্যা মামলার বিচার সম্পন্ন করার ঘটনা এটিই প্রথম।

যে নৃশংসতায় কেঁপে উঠেছিল পল্লবী

মামলার বিবরণ ও আসামির স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীর একটি আবাসিক বাসার তৃতীয় তলার ফ্ল্যাট থেকে ওই শিশুর খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার দিন সকালে পাশের ফ্ল্যাটের লোকজন বাইরে গেলে নেশাগ্রস্ত সোহেল রানা ওই শিশুকে ডেকে নিজের ফ্ল্যাটের বাথরুমে নিয়ে যায়। সেখানে জোরপূর্বক ওড়না দিয়ে মুখ বেঁধে তাকে ধর্ষণ করে সে।

ধর্ষণের পর শিশুটি অজ্ঞান হয়ে পড়লে তাকে মৃত ভেবে লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে ছুরি এনে তার মাথা কেটে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে সোহেল। এরপর হাত কাটার চেষ্টা করার সময় বাইরে শিশুর মায়ের আওয়াজ ও জুতা দেখে ভয় পেয়ে সেলাইরেঞ্জ দিয়ে জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায় সে। এই হত্যাকাণ্ডে তাকে সরাসরি সহায়তা করার অপরাধে তার স্ত্রী স্বপ্নাকেও আদালত সমদণ্ড দিয়েছেন।

রেকর্ড গতিতে তদন্ত ও বিচার

হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ আসামিদের গ্রেপ্তার করলে সোহেল রানা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে নিজের দোষ স্বীকার করে লোমহর্ষক জবানবন্দি দেন। ঘটনার পর রেকর্ড ৫ দিনের মাথায় গত ২৪ মে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান ভূঁইয়া।

চলতি জুন মাসের ১ তারিখে ঈদুল আজহার ছুটি শেষে আদালতের প্রথম কার্যদিবসেই আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জগঠন করে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। ২ জুন মামলার ১৭ জন সাক্ষীর মধ্যে শিশুটির বাবা, মা, বোনসহ ১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন করা হয়। ৩ জুন আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন এবং ৪ জুন উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে আদালত রায়ের জন্য আজকের দিন (৭ জুন) ধার্য করেছিলেন।

ছুটি বাতিল করে রায়, সন্তুষ্ট রাষ্ট্রপক্ষ

সাধারণত দেশের বিচারিক আদালতগুলোতে এই সময়ে অবকাশকালীন ছুটি চললেও, এই স্পর্শকাতর মামলাটির গুরুত্ব বিবেচনা করে ট্রাইব্যুনালের ছুটি বাতিল করে মাত্র ৭ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার প্রক্রিয়া শেষ করা হয়।

আজ রায় ঘোষণার সময় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে প্রধান আসামি সোহেল রানা বিচারকের উদ্দেশ্যে বলেন, “আমার একটি ছাওয়াল আছে স্যার, আমাকে মাফ করেন।” তবে অপরাধের চরম নৃশংসতার কথা বিবেচনা করে আদালত আসামিদের কোনো অনুকম্পা দেখাননি।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন,

“এই রায় সমাজের অপরাধীদের জন্য একটি কঠোর বার্তা। এত কম সময়ে সুষ্ঠু বিচার সম্পন্ন হওয়া দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।”