৬১

আর্টেমিস–২ মিশন গতকাল তাদের বহু প্রতীক্ষিত চন্দ্র উড্ডয়ন সম্পন্ন করে এবং চাঁদের মাত্র ৪,০৬৭ মাইলের মধ্যে দিয়ে অতিক্রম করে।

ওরিয়ন ক্যাপসুলে চাঁদের দূর পাশ অতিক্রম করার সময় ক্রু সদস্যরা পৃথিবী থেকে আনুমানিক ২,৫২,৭৫৬ মাইল দূরে পৌঁছান, যা অ্যাপোলো–১৩ মিশনের রেকর্ড ভেঙে মানবজাতির এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ দূরত্ব হিসেবে নতুন ইতিহাস গড়ে। এই উড্ডয়ন প্রায় সাত ঘণ্টা স্থায়ী হয়, যার মধ্যে নভোচারীরা চাঁদের এমন দৃশ্য দেখেন যা আগে কোনো মানুষের চোখে ধরা পড়েনি। তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে চাঁদের অদেখা দূর পাশের প্রায় ২১ শতাংশ সূর্যের আলোয় আলোকিত ছিল।

নাসার লাইভস্ট্রিম অনুযায়ী, নাসার নভোচারী রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন দুই শিফটে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা কাজ করে প্রায় ১০,০০০ ছবি তোলেন। চাঁদের পেছন দিক দিয়ে অতিক্রমের সময় প্রায় ৪০ মিনিটের জন্য ওরিয়নের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল।

এই সময় ক্রুরা ‘আর্থসেট’ দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন, যেখানে পৃথিবী চাঁদের পেছনে অস্ত যেতে দেখা যায়—যা ১৯৬৮ সালের অ্যাপোলো নভোচারীদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিল রয়েছে। চাঁদের পৃষ্ঠজুড়ে অসংখ্য ক্রেটার দেখা যায়। পৃথিবীর আলোকিত অংশে অস্ট্রেলিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলের ওপর মেঘ দেখা গেলেও অন্ধকার অংশে রাত বিরাজ করছিল।

আর্টেমিস বিজ্ঞান দল নভোচারীদের নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্য খুঁজে দেখতে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল, যেমন প্রাচীন লাভা প্রবাহ ও আঘাতজনিত গর্ত। আর্থসেট ছবিতে তারা হার্টজস্প্রাং বেসিন শনাক্ত করেন, যা দুটি সমকেন্দ্রিক বৃত্তের মতো দেখা যায়। এছাড়া ওরিয়েন্টালে বেসিনের চারপাশের বলয়ও তারা পর্যবেক্ষণ করেন, যা চাঁদের অন্যতম নবীন বৃহৎ আঘাতজনিত গর্ত এবং এই মিশনের আগে মানবচোখে দেখা যায়নি।

ওরিয়েন্টালে বেসিনের কাছে দুটি ছোট গর্তের নাম প্রস্তাব করা হয়—একটির নাম ‘ইন্টেগ্রিটি’, যা ওরিয়ন মহাকাশযানের সম্মানে, এবং অন্যটির নাম ‘ক্যারল’, যা মিশন কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যানের প্রয়াত স্ত্রী ক্যারল টেইলর ওয়াইজম্যানের স্মরণে রাখা হয়। নামকরণের পর চার নভোচারী আবেগঘন মুহূর্তে একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন এবং নাসার মিশন কন্ট্রোল (হিউস্টন)-এ এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

উড্ডয়নের পরবর্তী অংশে ক্রুরা একটি বিশেষ সূর্যগ্রহণ প্রত্যক্ষ করেন। তাদের কাছে চাঁদ ওরিয়ন ক্যাপসুলের জানালা দিয়ে পৃথিবীর তুলনায় অনেক বড় দেখায়। চাঁদ সূর্যকে আড়াল করলে সূর্যের বাইরের বায়ুমণ্ডল বা করোনা দেখা যায়, যেখানে ‘স্ট্রিমার’ নামের সূক্ষ্ম কাঠামোগুলো তারা ‘বেবি হেয়ারস’-এর মতো বর্ণনা করেন।

এই সময় পূর্ণগ্রাস অবস্থার স্থায়িত্ব প্রায় এক ঘণ্টা ছিল, যেখানে পৃথিবীতে সাধারণত এটি কয়েক মিনিট স্থায়ী হয়। গ্রহণ চলাকালে তারা মঙ্গল, শুক্র ও শনি গ্রহ এবং নক্ষত্রসহ পৃথিবীর আলো প্রতিফলিত ‘আর্থশাইন’ও দেখতে পান।

মিশনের পর আর্টেমিস–২ কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান নাসার বিজ্ঞান দলকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তারা একটি চমৎকার অভিজ্ঞতা দিয়েছেন এবং সবাই একসঙ্গে কাজ করে এই সাফল্য অর্জন করেছে। অপরদিকে বিজ্ঞান কর্মকর্তা ড. কেলসি ইয়ং জানান, এই মিশন থেকে ইতিমধ্যেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক তথ্য পাওয়া গেছে এবং এটি সমগ্র পৃথিবীর মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে। এই তোলা ছবিগুলো চাঁদের গঠন ও উৎপত্তি সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা সমৃদ্ধ করবে এবং ভবিষ্যতের চন্দ্র অভিযানের জন্য ভিত্তি তৈরি করবে।