৪৭

দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া চিনিতে বিপজ্জনক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক-এর উপস্থিতি পাওয়ার কথা জানিয়েছেন একদল গবেষক। অতি সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানা গেছে, বাজারে থাকা চিনির ৯৫ শতাংশ নমুনাতেই রয়েছে এসব ক্ষতিকর অতিসূক্ষ্ম প্লাস্টিক কণা।

আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালিসিস’ (Journal of Food Composition and Analysis)-এ গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণাটি যৌথভাবে পরিচালনা করেছেন সাদিয়া আফরিন, নায়ন হোসেন ও মোস্তাফিজুর রহমান।

ব্র্যান্ডেড ও খোলা চিনিতে দূষণের চিত্র

ঢাকার বিভিন্ন খুচরা বাজার থেকে সংগ্রহ করা প্যাকেটজাত (ব্র্যান্ডেড) এবং খোলা (নন-ব্র্যান্ডেড)—এই দুই ধরনের মোট সাতটি বাণিজ্যিক চিনির নমুনা বিশ্লেষণ করে এই তথ্য পাওয়া গেছে:

  • খোলা চিনি: গড়ে প্রতি কেজিতে ৪০৩টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা উদ্ধার করা হয়েছে।
  • ব্র্যান্ডেড চিনি: গড়ে প্রতি কেজিতে ৩২২টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি কেজি চিনিতে সর্বনিম্ন ২১০টি থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৫০৮টি পর্যন্ত প্লাস্টিক কণা অবস্থান করছে।

প্লাস্টিক কণার ধরণ ও কেমিক্যাল উপাদান

পরীক্ষায় উদ্ধার হওয়া কণাগুলোর আকার ছিল ১২ মাইক্রোমিটার থেকে ৩.১৯ মিলিমিটার পর্যন্ত। শনাক্ত হওয়া কণাগুলোর মধ্যে ছিল:

  • তন্তু বা ফাইবার: ৬৩%
  • খণ্ড বা ফ্র্যাগমেন্ট: ২১%
  • পাতলা স্তর বা ফিল্ম: ১১%
  • গোলাকার কণা: ৫%

রাসায়নিক বিশ্লেষণে চিনিতে বিভিন্ন ক্ষতিকর প্লাস্টিক পলিমারের উপস্থিতি মিলেছে, যার মধ্যে অন্যতম—অ্যাক্রাইলোনাইট্রাইল বিউটাডিয়ান স্টাইরিন (ABS), পলিভিনাইল ক্লোরাইড (PVC), পলিইথিলিন টেরেফথ্যালেট (PET), পলিটেট্রাফ্লুরোইথিলিন (PTFE), হাই-ডেনসিটি পলিইথিলিন (HDPE) এবং নাইলন।

উৎস ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

গবেষকদের মতে, চিনি উৎপাদন ও পরিশোধনের ক্ষেত্রে প্লাস্টিক ফিল্টার, পাইপ, বস্তা, কনভেয়ার বেল্ট ও প্লাস্টিকের প্যাকেজিং ব্যবহারের মাধ্যমে এসব কণা চিনিতে প্রবেশ করে। এছাড়া পরিবহন, খোলা অবস্থায় সংরক্ষণ এবং বাতাসের মাধ্যমেও চিনিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক মিশতে পারে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধু চিনি খাওয়ার মাধ্যমে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতিদিন গড়ে প্রতি কেজি শারীরিক ওজনের বিপরীতে ০.২১৭৮টি মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণ করেন। এটি মানুষের শরীরে ধীরে ধীরে প্লাস্টিক জমার একটি ধারাবাহিক মাধ্যম হয়ে উঠছে, যা দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

গবেষকরা পরামর্শ দিয়েছেন, দ্রুত দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থায় মাইক্রোপ্লাস্টিক মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ মানদণ্ড নিশ্চিত করা এবং প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।