৬

পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে গাজীপুরে চলমান আন্দোলন ঘিরে বুধবার দিনভর উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সকালে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এবং বাসন থানায় হামলার চেষ্টার ঘটনা ঘটে। দুপুরে নিহত শ্রমিক তৌফিক হোসেনের গায়েবানা জানাজা ঘিরেও উত্তেজনা তৈরি হয়। তবে বিকেলের দিকে পরিস্থিতি অনেকটা শান্ত হয়ে আসে। বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল ও মহাসড়কে যানবাহন চলাচলও স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

বুধবার (৪ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে গাজীপুর মহানগরের গাছা থানার সাইনবোর্ড ও বোর্ডবাজারের বড়বাড়ী এলাকায় কয়েক হাজার শ্রমিক ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। এতে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শ্রমিকদের সরিয়ে দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এগিয়ে গেলে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। এ সময় ইটপাটকেল নিক্ষেপের পাশাপাশি পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনাও ঘটে।

গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানান, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে গাছা থানা এলাকায় দুই থেকে চার হাজার শ্রমিক সড়কে নেমে আসেন। তাঁদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। পরে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের সরিয়ে দেওয়া হয়। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে জয়দেবপুরের দিকেও শ্রমিকেরা অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁদেরও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সালনা, রাজেন্দ্রপুর, শফিপুর ও পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও কাশিমপুরে কিছুটা উত্তেজনা ছিল।

সকালের সংঘর্ষের পর বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ বাসন থানায় হামলার চেষ্টা চালায়। এ সময় থানার ভেতরে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলার চেষ্টা করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষের কারণে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। গাজীপুরগামী অনেক বাস মাঝপথ থেকে ঘুরিয়ে দেওয়ায় যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েন।

দুপুর পৌনে ১টার দিকে চান্দনা চৌরাস্তায় আন্দোলনের মধ্যে নিহত পোশাকশ্রমিক তৌফিক হোসেনের গায়েবানা জানাজার আয়োজন করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও জাতীয় শ্রমিক শক্তি। আয়োজকদের অভিযোগ, জানাজার প্রস্তুতির সময় পুলিশ ও বিজিবি সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে উপস্থিত লোকজনকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এতে জানাজা অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। এ ঘটনায় এনসিপি ও সহযোগী সংগঠনের ২০ জনের বেশি নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে দলটি।

এনসিপির কেন্দ্রীয় মুখ্য সংগঠক ও নির্বাহী কমিটির সদস্য আলী নাছের খান অভিযোগ করেন, তাঁদের শান্তিপূর্ণ ধর্মীয় কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হয়েছে। তিনি শ্রমিক তৌফিক হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত, বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। পাশাপাশি শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিগুলো মেনে নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার করেছে জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বিজিবি, আনসার ও স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) মোট ২৫ প্লাটুন সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে বিজিবির ১২, আনসারের পাঁচ এবং এসআরবির আট প্লাটুন সদস্য রয়েছেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় বিজিবির সদস্যসংখ্যা আগের ১১ প্লাটুন থেকে বাড়িয়ে ১২ প্লাটুন করা হয়েছে।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সভাপতি মো. শওকত হোসেন সরকার সকালে নেতাকর্মীদের নিয়ে কাশিমপুর, কোনাবাড়ী, ভোগড়া বাইপাস ও চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় অবস্থান নেন। তিনি শ্রমিকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান। তাঁর ভাষ্য, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি যৌক্তিক এবং সরকার ইতোমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। তাই আলোচনার মাধ্যমে দাবি আদায়ের চেষ্টা করা উচিত। শিল্পকারখানা সচল রাখা শ্রমিক, মালিক ও দেশের অর্থনীতির স্বার্থে জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

উল্লেখ্য, শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে ভিডিও ধারণকে কেন্দ্র করে মারধরের শিকার হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান পোশাকশ্রমিক তৌফিক হোসেন। তিনি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কোচাশহর ইউনিয়নের ছয়ঘরিয়া গ্রামের তবি খাঁর ছেলে। গাজীপুরের বাংলাবাজার এলাকায় ভাড়া বাসায় থেকে লায়লা স্টাইলস লিমিটেডে কাজ করতেন তিনি।

তৌফিকের বড় ভাই হারুন মিয়ার অভিযোগ, কারখানা ভাঙচুর করতে আসা আন্দোলনকারী পরিচয় দেওয়া দুই ব্যক্তি তাঁকে মারধর করেন। এতে গুরুতর আহত হয়ে ঘটনাস্থলেই রক্তবমি শুরু হয় তাঁর। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে, পুলিশের অভিযানে তৌফিক আহত হননি; ভিডিও ধারণের সময় শ্রমিকদের মারধরে তিনি আহত হয়েছিলেন।

দিনভর সংঘর্ষ ও বিক্ষোভের পর বিকেলের দিকে গাজীপুরের পরিস্থিতি অনেকটা শান্ত হয়ে আসে। বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল ও মহাসড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। তবে নতুন করে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।