২৯

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় ধরনের পরাজয়ের পর ভারতজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের বন্যা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাশাপাশি কটাক্ষের কেন্দ্রে রয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং দেশটির মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার।

নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নানা ধরনের মিম ও কৌতুক ছড়িয়ে পড়ছে। এসব পোস্টে বারবার উঠে আসছে জ্ঞানেশ কুমারের নাম। কারণ, কিছুদিন আগেই ভারতের নির্বাচনব্যবস্থার প্রশংসা করেছিলেন ট্রাম্প। সেই বক্তব্যকে সামনে রেখেই তাঁকে নিয়ে ব্যঙ্গ করছেন ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, অধিকারকর্মী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারকারীরা।

কেউ কৌতুক করে বলছেন, জ্ঞানেশ কুমার থাকলে ট্রাম্পকে এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না। কেউ আবার ট্রাম্পের কাছে জ্ঞানেশের ফোন নম্বর চেয়েছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি ও ট্রাম্পের করমর্দনের একটি ছবি ব্যবহার করে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মহুয়া মৈত্র লিখেছেন, ‘ফ্রান্ড, ডোলান্ড নিডস জ্ঞানু।’ পোস্টে মোদির পক্ষ থেকে ট্রাম্পকে জ্ঞানেশের নম্বর পাঠানোর প্রস্তাব দেওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে।

মোদির উচ্চারণভঙ্গি নিয়েও রয়েছে এই কৌতুকের ইঙ্গিত। তরুণদের উদ্দেশে কথা বলার সময় ‘ফ্রেন্ড’ শব্দটি তাঁর উচ্চারণে ‘ফ্রান্ড’ শোনানোর বিষয়টি তুলে ধরে মহুয়া মৈত্র এই ব্যঙ্গ করেছেন।

ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতা অভিজিৎ দিপকও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, জ্ঞানেশ কুমার থাকলে ট্রাম্পের সঙ্গে এমনটা কিছুতেই হতে দিতেন না। তাঁর এই মন্তব্যও ব্যাপক আলোচনায় এসেছে।

কংগ্রেসের মুখপাত্র পবন খেরা ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে লিখেছেন, জ্ঞানেশ কুমারকে পাশে রাখলে তাঁকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো না। ভারতের নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে ট্রাম্পের আগের প্রশংসার বক্তব্য স্মরণ করিয়ে দিয়েই তিনি এই কটাক্ষ করেন।

গত আগস্টে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ভারতের নির্বাচন পরিচালনার প্রশংসা করেছিলেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি দাবি করেন, দেশটির মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার মার্কিন প্রশাসনের এক কর্মকর্তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, বৈধ পরিচয়পত্র ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে কীভাবে ভোট গ্রহণ করা হয়। ভারতের নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক ভোটার অংশগ্রহণ এবং পরিচয়পত্র দেখিয়ে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করেছিলেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রেও একই ধরনের আইন চালুর আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন তিনি।

জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিও ট্রাম্পের সেই বক্তব্য সামনে এনে কটাক্ষ করেছেন। জ্ঞানেশ কুমারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়ার ঘটনায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে তিনি দেশ ছেড়ে যান। তাঁর বিরুদ্ধে পুরোনো একটি মামলায় নতুন করে সমন জারির বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্পের আগের বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে পোস্ট দিয়েছেন তিনি।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও আন্দোলনকর্মী প্রশান্ত ভূষণও ব্যঙ্গাত্মক পোস্টে অংশ নিয়েছেন। মোদি ও ট্রাম্পের কাল্পনিক কথোপকথনের মাধ্যমে তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, জ্ঞানেশ কুমারকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর সুযোগ নেই; কারণ ভারতেও তাঁকে ঘিরে বিতর্ক ও আন্দোলন চলছে।

সাধারণ ব্যবহারকারীরাও বিভিন্ন মিম ও কৌতুকের মাধ্যমে ট্রাম্প, মোদি ও জ্ঞানেশকে নিয়ে বিদ্রূপ করছেন। কোনো পোস্টে ট্রাম্পকে নির্বাচনী কৌশলে অনভিজ্ঞ বলা হয়েছে, আবার কোনো পোস্টে ভারতের নির্বাচন কমিশনের কৌশল অনুসরণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এআই দিয়ে তৈরি ভিডিওতেও ট্রাম্পকে নিয়ে নানা ব্যঙ্গাত্মক দৃশ্য ছড়িয়ে পড়েছে।

এই বিদ্রূপের পাশাপাশি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও শুরু হয়েছে নতুন করে বাক্‌যুদ্ধ। আম আদমি পার্টি ছেড়ে কংগ্রেসে যোগ দেওয়া প্রিয়াঙ্কা কক্কর লিখেছেন, ‘টুডে পোটাস, টুমরো লোটাস।’ এখানে ‘পোটাস’ বলতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে এবং ‘লোটাস’ বলতে বিজেপির নির্বাচনী প্রতীক পদ্মফুলকে বোঝানো হয়েছে।

প্রিয়াঙ্কার এই মন্তব্যের জবাবে বিজেপির মুখপাত্র প্রদীপ ভান্ডারী লিখেছেন, ‘পোটাস আসবে-যাবে, লোটাস চিরস্থায়ী।’ কংগ্রেস নেতা কে সি বেণুগোপাল অবশ্য এই রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘বাতাসে পরিবর্তনের হাওয়া।’

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ফলাফলকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে ট্রাম্প, মোদি ও জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে এই আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন বিজেপি ও বিরোধী কংগ্রেসের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যেও স্পষ্ট হচ্ছে, মার্কিন নির্বাচনের প্রভাব ভারতের রাজনৈতিক আলোচনাতেও পড়েছে।