৩৮

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও ঘটনার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হতে পারেননি তদন্তকারীরা। অর্ধশতাধিক সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তাঁর শেষ রাতের অনেকটা সময়ের গতিপথ শনাক্ত করা গেলেও মৃত্যুর আগের গুরুত্বপূর্ণ ১৫ মিনিটের কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। এই সময়ের ঘটনাপ্রবাহই এখন তদন্তের অন্যতম বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর রাতে উত্তরার একটি বার থেকে বেরিয়ে বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে সঙ্গে নিয়ে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যান তাহসিফ। সেখানে মাদক কেনা ও সেবনের অভিযোগ উঠে এসেছে দীপের জিজ্ঞাসাবাদে দেওয়া বক্তব্যে। পরে পুলিশের টহল দল এলাকায় গেলে দুজন আলাদা হয়ে যান বলে দাবি করেন তিনি।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, রাত ১টা ৫ মিনিটের দিকে আট সদস্যের পুলিশের একটি দল টঙ্গীর মাজার বস্তির পাশের একটি মাঠে প্রবেশ করে। প্রায় ১৫ মিনিট পর রাত ১টা ২০ মিনিটে দলটিকে ওই এলাকা থেকে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। একই সময়ে দীপকেও বস্তিতে ফিরে আসতে দেখা যায়। কিন্তু ওই সময় তাহসিফ কোথায় ছিলেন, তা নিশ্চিত করতে পারেননি তদন্তকারীরা।

রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফের মায়ের ফোনে একটি বার্তা আসে। এর আগের ১৫ মিনিটে তাঁর সঙ্গে কী ঘটেছিল, তা এখনো অজানা। তাহসিফের মরদেহ গত ২৮ অক্টোবর বিকেলে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। তাঁর বাবা কে এম এনায়েতুল করিম এ ঘটনায় হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় দীপ ও তাঁদের সঙ্গে থাকা এক তরুণীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তদন্তে চারটি সম্ভাবনা

তদন্তকারীরা আপাতত কয়েকটি সম্ভাবনা সামনে রেখে কাজ করছেন। পূর্বশত্রুতা, আর্থিক লেনদেন কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে তাহসিফকে হত্যা করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি পুলিশের উপস্থিতিতে পালানোর সময় দুর্ঘটনাবশত নদে পড়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে কি না, সেই সম্ভাবনাও বিবেচনায় রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো কারণই নিশ্চিত হয়নি।

তৃতীয় দফা রিমান্ড আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন, তাহসিফের মৃত্যুর কারণ, ঘটনার পরিকল্পনাকারী ও সহযোগীদের শনাক্ত করা জরুরি। হত্যাকাণ্ডে কোনো আলামত ব্যবহৃত হয়ে থাকলে তা উদ্ধার এবং ভাড়াটে খুনি বা অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য ও আসামিদের বক্তব্য মিলিয়ে দেখার কথা বলা হয়েছে।

টঙ্গীতে যাওয়ার পেছনে কী কারণ ছিল

দীপের জিজ্ঞাসাবাদে দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৮ মিনিটে তাহসিফ, দীপ ও তাঁদের সঙ্গে থাকা এক তরুণী উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের একটি বারে যান। ওই তরুণীর সঙ্গে অন্য এক যুবকের সম্পর্কের বিষয়টি জানার পর তাহসিফ মন খারাপ করেছিলেন বলে দাবি করেন দীপ। বিষয়টি নিয়ে তাঁদের মধ্যে কথাকাটাকাটিও হয়।

দীপের ভাষ্য, বারে গিয়ে তাহসিফ স্যাড মিউজিক বাজানোর অনুরোধ করেন। পরে তিনজনই মদ্যপান করেন। রাত ১২টা পর্যন্ত ওই তরুণীর সঙ্গে অন্য যুবকের সম্পর্ক নিয়ে তাহসিফের কথা-কাটাকাটি চলে। একপর্যায়ে তিনি হেরোইন সেবনের কথা বলেন বলেও দাবি করেন দীপ।

রাত ১২টার দিকে বার থেকে বেরিয়ে তাহসিফ ওই তরুণীকে তাঁর বাসায় পৌঁছে দেন। এরপর দীপকে নিয়ে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যান। দীপের দাবি, সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত তাহসিফ নিজেই নিয়েছিলেন। বস্তির কাছে মোটরসাইকেল রেখে তাঁরা একটি মাঠের দিকে যান। সেখানে তাহসিফ হেরোইন চান এবং পরে কয়েকজনের কাছ থেকে তা কিনে সেবন করেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন দীপ।

সিসিটিভিতে শেষ গতিপথ

তদন্তকারীরা জানান, বস্তিতে প্রবেশের মুখে থাকা ক্যামেরার ফুটেজে রাত ১২টা ৩৯ মিনিটে তাহসিফকে দ্রুতগতিতে প্রবেশ করতে দেখা যায়। কিছুক্ষণ পর সেখানে পৌঁছায় দীপের মোটরসাইকেল। রাত ১২টা ৪০ মিনিটে একটি গলিতে ঢোকার চেষ্টা করার সময় স্থানীয় এক নারী তাঁদের বাধা দেন। ওই নারীর সঙ্গে তাহসিফের কথাকাটাকাটিও হয়।

ওই নারীর ভাষ্য অনুযায়ী, তাহসিফকে ভেতরে যেতে নিষেধ করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি বাধা উপেক্ষা করে গলির দিকে এগিয়ে যান। পরে তাঁরা মাজার গেটের সামনে পৌঁছান। সেখানকার ক্যামেরায় রাত ১২টা ৫২ মিনিটে তাহসিফকে দেখা যায়। তাঁর পেছনে ছিলেন দীপ।

মাজার গেট পার হওয়ার পর থেকে মাঠের কাছাকাছি এলাকা পর্যন্ত আর কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল না। ফলে ওই অংশে তাঁদের গতিবিধির কোনো ভিডিও পাওয়া যায়নি।

রাত ১টা ৫ মিনিটে পিংকি গার্মেন্টসের সামনের ক্যামেরায় আট সদস্যের পুলিশের একটি দলকে মাঠে প্রবেশ করতে দেখা যায়। দীপের দাবি, পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে সেখানে থাকা লোকজন দৌড়ে পালাতে শুরু করেন। তিনিও নদীর পাড়ের দিকে গিয়ে তুরাগ নদের ২৯ নম্বর পিলারের পেছনে লুকান। আর তাহসিফ চলে যান নদীর তীরের দিকে। এরপর তাঁর সঙ্গে কী ঘটেছিল, তা দীপ জানেন না বলে দাবি করেছেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, পুলিশ অভিযান চালাতে এলে অনেকে ধরা পড়ার ভয়ে পানিতে নেমে নদ পার হয়ে পালিয়ে যান। তাহসিফও পালাতে গিয়ে পানিতে পড়েছিলেন কি না, নাকি তাঁর সঙ্গে অন্য কোনো ঘটনা ঘটেছিল, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

রাত ১টা ২০ মিনিটে পুলিশের দলটিকে মাঠ থেকে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। একই সময়ে দীপকেও বস্তিতে ফিরে আসতে দেখা যায়। রাত ১টা ২১ মিনিটে আরেকটি ক্যামেরায় তাঁকে হাঁটতে দেখা গেছে। এরপর আর কোনো ফুটেজে তাঁর উপস্থিতি শনাক্ত করা যায়নি। দীপের দাবি, রাত ১টা ৫২ মিনিটে তিনি তাহসিফকে রেখে বাসায় চলে যান। তবে মাঝের সময়টিতে তিনি কোথায় ছিলেন, সে বিষয়েও ফুটেজে স্পষ্ট তথ্য মেলেনি।

ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন নিয়ে অপেক্ষা

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাহসিফের মরদেহে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্ত ও পরীক্ষাগারের প্রতিবেদনের অপেক্ষা করছেন তাঁরা। ময়নাতদন্তের সময় তাঁর পাকস্থলী ও কিডনির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি ভিসেরা, রক্ত ও ডিএনএ পরীক্ষার নমুনাও সংগ্রহ করা হয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, দীপকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত নয়।

তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদ্‌ঘাটন করতে পারবে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

নৌ পুলিশ ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, রিমান্ডে আসামিদের দেওয়া বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে। তদন্তের বাকি কাজ শেষ করে ঘটনার প্রকৃত চিত্র বের করার চেষ্টা চলছে।

তাহসিফের শেষ রাতের বেশির ভাগ গতিপথের তথ্য পাওয়া গেলেও মৃত্যুর আগের গুরুত্বপূর্ণ সময়টি এখনো অন্ধকারে। সেই সময়ের কোনো প্রত্যক্ষদর্শী, নির্ভরযোগ্য ভিডিও বা চূড়ান্ত ফরেনসিক তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।