৯

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুরহস্য তদন্তে নতুন কিছু তথ্য পেয়েছে পুলিশ। গ্রেপ্তার বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের রিমান্ডে দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, মৃত্যুর রাতে উত্তরার একটি বারে মদ্যপানের পর হেরোইন খুঁজতে টঙ্গীর একটি মাঠে গিয়েছিলেন তাহসিফ। সেখানে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে দীপ পালিয়ে আত্মগোপন করেন। এরপর থেকেই তাহসিফের সঙ্গে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

তবে ঠিক কীভাবে তাহসিফ তুরাগ নদে পড়ে মারা গেলেন, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি তদন্তকারীরা। প্রাথমিকভাবে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর সম্ভাবনা বিবেচনায় নেওয়া হলেও হত্যা বা অন্য কোনো অপরাধের সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৮ মিনিটে তাহসিফ, তার বান্ধবী জারিকা তাসনিম দিশা এবং বন্ধু দীপ উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের নেস্ট বারে যান। কয়েক দিন আগে দিশার সঙ্গে অন্য এক যুবকের মাদক সেবন ও সম্পর্কের বিষয়টি জানতে পেরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন তাহসিফ। এ নিয়ে বারে তাদের মধ্যে কথা-কাটাকাটিও হয়।

দীপের ভাষ্য, বারে গিয়ে তাহসিফ বিষণ্ন সংগীত বাজানোর অনুরোধ করেন। পরে তিনজন মদ্যপান করেন। রাত ১২টার দিকে দিশার সঙ্গে অন্য যুবকের সম্পর্ক নিয়ে বিরোধের একপর্যায়ে তাহসিফ হেরোইন সেবনের কথা বলেন।

টঙ্গীর মাঠে হেরোইন খুঁজতে যান তাহসিফ

রাত ১২টার দিকে বার থেকে বেরিয়ে তাহসিফ দিশাকে উত্তরার বাসায় পৌঁছে দেন। দীপও সেখানে যান। পরে দুজন মোটরসাইকেলে টঙ্গী বাজার বস্তিসংলগ্ন একটি মাঠের উদ্দেশে রওনা হন। দীপের দাবি, সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তাহসিফ নিজেই।

মাঠের পাশে মোটরসাইকেল রেখে দুজন ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে স্থানীয় মাদকসেবী ও কারবারিদের উপস্থিতিতে তাহসিফ হেরোইন চান এবং প্রয়োজনীয় টাকা দিতে রাজি হন। পরে কয়েকজনের কাছ থেকে হেরোইন সংগ্রহ করে সেবন করেন তিনি।

দীপের দাবি, মদ্যপানের পর হেরোইন সেবনে তাহসিফ নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছিলেন। এমন সময় সেখানে পুলিশের একটি টহল দল পৌঁছায়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে স্থানীয় মাদক কারবারিরা পালিয়ে যান। দীপও দৌড়ে নদীর পাড়ের দিকে গিয়ে ২৯ নম্বর পিলারের পেছনে আত্মগোপন করেন। এ সময় তাহসিফের সঙ্গে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

দীপের বক্তব্য অনুযায়ী, দুই থেকে তিন মিনিট পর দুই পুলিশ সদস্য তাকে ঘিরে ধরেন। পরিচয় জানতে চাইলে তিনি নিজেকে ক্যাপ্টেন তাহসিফের বন্ধু বলে পরিচয় দেন। মোহাম্মদপুরে বাসা থাকার কথা জানালে এত রাতে সেখানে আসার কারণ জানতে চান পুলিশ সদস্যরা। পরে তাকে চলে যেতে বলা হলে তিনি বস্তির ভেতরের সরু রাস্তা দিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে যান।

একাধিকবার ফোন করেও পাননি তাহসিফকে

বস্তি এলাকা থেকে বেরিয়ে এক ব্যক্তির সহায়তায় মূল সড়কে ফিরে নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে তাহসিফকে ফোন করেন দীপ। কিন্তু প্রতিবারই ফোন বন্ধ পান বলে দাবি করেছেন তিনি।

দীপের ধারণা ছিল, হেরোইন সেবনের উদ্দেশ্যেই তাহসিফ সেখানে গিয়েছেন। তাই মাদক সংগ্রহ না করে তিনি ফিরে যাবেন না। এ ছাড়া তাহসিফ তার কাছ থেকে ফোন চার্জ দেওয়ার জন্য একটি পাওয়ার ব্যাংক নিয়েছিলেন। সে কারণে ফোনের চার্জ শেষ হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে বলেও মনে করেছিলেন দীপ। পরে মোহাম্মদপুরের বাসায় ফিরে ঘুমিয়ে পড়েন তিনি।

তাহসিফকে নদে পড়ে যেতে বা পানিতে ডুবে যেতে দেখেননি বলেও জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন দীপ।

প্রাথমিক তদন্তে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার ভাষ্য, দীপকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। তার দেওয়া তথ্য যাচাইয়ের পাশাপাশি বারের ঘটনা, মোবাইল ফোনের তথ্য এবং অন্যান্য পারিপার্শ্বিক বিষয় বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

তাহসিফের মরদেহে বাইরে থেকে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, টহল দলের উপস্থিতিতে পালানোর সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তিনি পানিতে পড়ে যেতে পারেন। তবে এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।

তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, দীপের বক্তব্য আরও যাচাই করা প্রয়োজন। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্ত ও রাসায়নিক পরীক্ষার ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ। তাহসিফ মাদক সেবন করেছিলেন কি না, কিংবা তার শরীরে কোনো বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল কি না, পরীক্ষায় তা-ও জানা যেতে পারে।

মাঠে যাওয়ার ভিডিও পেয়েছে পুলিশ

তাহসিফ ও দীপের টঙ্গী বাজার বস্তিসংলগ্ন মাঠে যাওয়ার একটি ভিডিও তদন্তকারীদের হাতে এসেছে। ভিডিওতে তাহসিফকে বস্তির সরু রাস্তা দিয়ে মাঠের দিকে যেতে দেখা যায়। তার পেছনে হাতে হেলমেট নিয়ে হাঁটছিলেন দীপ। ওই সময় তাহসিফকে বলতে শোনা যায়, ‘দীপ, ডোন্ট টক টু মাচ, লেটস ওয়াক।’

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ময়নাতদন্তের সময় তাহসিফের পাকস্থলী ও কিডনির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি ভিসেরা ও রক্তের নমুনাও পাঠানো হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার জন্যও নমুনা সংগ্রহ করেছে পুলিশ।

ফরেনসিক বিভাগের এক কর্মকর্তার প্রাথমিক ধারণা, মরদেহটি আনুমানিক ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পানির নিচে ছিল। পানিতে ডুবেই তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ছাড়া নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। তাহসিফ সাঁতার জানতেন কি না, সেই বিষয়টিও বিবেচনায় নিয়ে কী পরিস্থিতিতে তিনি পানিতে পড়েছিলেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

যেভাবে উদ্ধার হয় তাহসিফের মরদেহ

গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় উত্তরার বাসা থেকে বন্ধু দীপের ডাকে বের হন ২৮ বছর বয়সী সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি। ওই রাতে মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলে বাসায় ফেরার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আর ফিরে আসেননি।

রাত ১টার দিকে তাহসিফের ফোন থেকে তার মায়ের মেসেঞ্জারে একটি ভয়েস বার্তা পাঠানো হয়। এতে বলা হয়েছিল, ‘রওনা দিসি আসতেছি’।

পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে চারটার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসতে থাকার খবর আসে। পরে টঙ্গী নৌপুলিশ রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে মরদেহটি উদ্ধার করে। পকেটে থাকা আইফোনের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করা হয়। সুরতহাল প্রতিবেদনে শরীরে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলে জানায় পুলিশ।

ঘটনার তদন্ত শুরু করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ২৯ অক্টোবর গভীর রাতে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বাসা থেকে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরদিন সকালে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।

প্রথমদিকে দীপ দাবি করেছিলেন, একটি রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার খাওয়ার পর উত্তরার হাউজ বিল্ডিং এলাকায় তাহসিফের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান তিনি। পরে জিজ্ঞাসাবাদে টঙ্গীর মাদক স্পটে যাওয়ার কথা জানান।

ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় শুরুতে মামলা করতে অনীহা প্রকাশ করলেও ৩০ অক্টোবর দিবাগত রাতে তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। মামলায় মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

পরে দীপকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠায় নৌপুলিশ। ৩১ অক্টোবর ঢাকা মহানগর হাকিম আদালত পুলিশের সাত দিনের রিমান্ড আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

অন্যদিকে, ১ নভেম্বর রাতে তাহসিফের সঙ্গে ঘটনার রাতে নেস্ট বারে যাওয়া জারিকা তাসনিম দিশাকে কাফরুলের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে নৌপুলিশ। তারও সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে।

তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, সিসিটিভি ফুটেজ ও তাহসিফের ফোনের কল রেকর্ড বিশ্লেষণ করে দিশার সঙ্গে তার যোগাযোগ এবং ঘটনার রাতে একসঙ্গে বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। দীপ ও দিশাকে জিজ্ঞাসাবাদ, ময়নাতদন্ত এবং রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পরই তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে।