আইন নয়, শক্তির শাসন: চরম ঝুঁকিপূর্ণ মিশনে নাটকীয়ভাবে মাদুরোকে তুলে নিল যুক্তরাষ্ট্র
নিকোলাস মাদুরো ও সিলিয়া ফ্লোরেস। ছবি: রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় শনিবার ভোর ৪টা ২১ মিনিটে নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’–এ দেওয়া এক বার্তায় সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করতে যুক্তরাষ্ট্র একটি দুঃসাহসিক সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে।
ঘটনাটি আকস্মিক বলে মনে হলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ছিল দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত একটি মিশন। কয়েক মাস ধরে চলেছে প্রস্তুতি, গোয়েন্দা নজরদারি এবং একাধিকবার পূর্ণাঙ্গ মহড়া। মার্কিন সেনাবাহিনীর ডেল্টা ফোর্সসহ বিভিন্ন এলিট ইউনিট মাদুরোর নিরাপদ আবাসনের হুবহু আদলে একটি কাঠামো তৈরি করে সেখানে প্রবেশের অনুশীলন চালায়।
অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ–এর একটি ছোট দল গত আগস্ট থেকেই এলাকায় সক্রিয় ছিল। তারা মাদুরোর দৈনন্দিন চলাচল, নিরাপত্তা বলয় ও অভ্যন্তরীণ অভ্যাস সম্পর্কে গভীর তথ্য সংগ্রহ করে, যা অভিযানের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
রয়টার্সকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাদুরোর ঘনিষ্ঠ একজন ব্যক্তি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যদাতা হিসেবে কাজ করছিলেন। অভিযান চলাকালে তিনি মাদুরোর নির্ভুল অবস্থান সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য সরবরাহে প্রস্তুত ছিলেন।
সব প্রস্তুতি শেষে চার দিন আগে ট্রাম্প অভিযানের অনুমোদন দেন। তবে সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা অপেক্ষাকৃত অনুকূল আবহাওয়ার জন্য অপেক্ষা করার পরামর্শ দেন। জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন জানান, শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় রাত ১০টা ৪৬ মিনিটে ‘অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলভ’–এর চূড়ান্ত অনুমোদন দেন ট্রাম্প।
অভিযানের পুরো সময় ট্রাম্প ফ্লোরিডার মার-আ-লাগোতে অবস্থান করে উপদেষ্টাদের সঙ্গে সরাসরি সম্প্রচার পর্যবেক্ষণ করেন।
পেন্টাগনের তত্ত্বাবধানে ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্যাপক সামরিক শক্তি মোতায়েন করা হয়। একটি বিমানবাহী রণতরি, ১১টি যুদ্ধজাহাজ, এক ডজনের বেশি এফ–৩৫ যুদ্ধবিমানসহ প্রায় ১৫ হাজার মার্কিন সেনা অংশ নেয়। দীর্ঘদিন ধরে এটিকে ‘মাদকবিরোধী অভিযান’ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও মূল লক্ষ্য ছিল ভিন্ন।
সূত্র জানায়, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী স্টিফেন মিলার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ও সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ একটি সমন্বিত কোর টিম গঠন করে মাসের পর মাস পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন।
শুক্রবার গভীর রাত থেকে শনিবার ভোর পর্যন্ত ট্রাম্প ও তাঁর উপদেষ্টারা রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ছিলেন। এ সময় মার্কিন যুদ্ধবিমান কারাকাস ও আশপাশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় হামলা চালায়। জেনারেল কেইনের ভাষ্য অনুযায়ী, পশ্চিম গোলার্ধের ২০টি ঘাঁটি থেকে এফ–৩৫, এফ–২২, বি–১ বোম্বারসহ ১৫০টির বেশি বিমান এই অভিযানে অংশ নেয়।
বিমান হামলার আড়ালে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত মার্কিন স্পেশাল ফোর্স কারাকাসে প্রবেশ করে। মাদুরোর অবস্থানস্থলের ইস্পাত দরজা ভাঙার প্রস্তুতি হিসেবে তাদের সঙ্গে ছিল বিশেষ কাটিং সরঞ্জাম।
শনিবার রাত আনুমানিক একটার দিকে মার্কিন বাহিনী শহরের কেন্দ্রে মাদুরোর কম্পাউন্ডে পৌঁছায়। সেখানে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। একটি উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সেটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়।
অভিযান সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা যায়, নিরাপদ আবাসনে প্রবেশের পর মার্কিন বাহিনী ও এফবিআই এজেন্টরা মাদুরো দম্পতিকে তাঁদের শোবার কক্ষ থেকেই আটক করেন। ট্রাম্পের দাবি, মাদুরো একটি সুরক্ষিত কক্ষে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু দ্রুত অভিযানের মুখে তা সম্ভব হয়নি।
এই অভিযানে কয়েকজন মার্কিন সেনা আহত হলেও কেউ নিহত হননি। ভেনেজুয়েলার আকাশসীমা ছাড়ার সময় একাধিক আত্মরক্ষামূলক সংঘর্ষে জড়াতে হয় বলে জানান জেনারেল কেইন। ভোর ৩টা ২০ মিনিটে উড়োজাহাজগুলো মাদুরো দম্পতিকে নিয়ে জলসীমায় পৌঁছে।
অভিযান ঘোষণার সাত ঘণ্টা পর ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে আরেকটি ছবি প্রকাশ করেন। সেখানে চোখ বাঁধা, হাতে হাতকড়া পরা নিকোলা মাদুরোকে দেখা যায়। ছবির ক্যাপশনে তিনি উল্লেখ করেন, উভচর যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আইডব্লিউও জিমা–তে মাদুরোকে নেওয়া হয়েছে।
কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ড্রোন হামলা: আহত ৪ বাংলাদেশি প্রবাসী