যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধের প্রভাব ছিল বলে স্বীকার করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল বলে মনে করেন তিনি। একই যুদ্ধকে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—কংগ্রেসের দুই কক্ষেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে ডেমোক্র্যাটরা। রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কয়েকটি রাজ্যেও জয় পেয়েছেন দলটির প্রার্থীরা। এই ফলাফলকে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি ও নেতৃত্বের প্রতি ভোটারদের অনাস্থার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন ডেমোক্র্যাট নেতারা।
নির্বাচনের ফলাফলে আগামী বছর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বিভক্ত সরকারব্যবস্থা কার্যকর হতে যাচ্ছে। নতুন কংগ্রেসের অধিবেশন শুরু হলে জ্বালানি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিতে চান ডেমোক্র্যাটরা। পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত ও নজরদারি বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের। প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরুর বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাটিক নেতা হাকিম জেফরিস বলেছেন, জনগণের প্রত্যাশা ও মতামতকে গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা। আগামী ৩ জানুয়ারি নতুন কংগ্রেসের কার্যক্রম শুরু হলে তাঁকে স্পিকার নির্বাচিত করা হতে পারে। তা হলে তিনি হবেন প্রতিনিধি পরিষদের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার।
নির্বাচনের ফলাফলকে ‘মাগা’ রাজনীতির বিরুদ্ধে জনগণের প্রত্যাখ্যান হিসেবে উল্লেখ করেছেন জেফরিস। তাঁর মতে, এই জয় মার্কিন জনগণের বিজয়।
সিনেটে ডেমোক্র্যাটিক নেতা চাক শুমার মনে করেন, ভোটারদের একটি বড় অংশ ডেমোক্র্যাটদের প্রতি পূর্ণ আস্থা থেকে নয়, বরং ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকানদের প্রত্যাখ্যান করতেই ভোট দিয়েছেন। বুধবার ক্যাপিটলে তিনি বলেন, এই বিজয় জনগণের আস্থা অর্জনের একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে।
দক্ষিণ ক্যারোলাইনা, টেক্সাস ও কানসাসের মতো রাজ্যে সিনেটের আসন জয়কে দলটির জন্য উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের কট্টরপন্থী, মধ্যপন্থী ও অভিজ্ঞ নেতাদের কয়েকজনও পরাজিত হয়েছেন।
পরাজয়ের পর ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করার ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। তবে তাঁদের কোনো উদ্যোগ নিজের কাছে গ্রহণযোগ্য না হলে প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি। পলিটিকোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, আগামী দুই বছর শুধু বিভিন্ন সিদ্ধান্তে ভেটো দিয়ে সময় কাটাতে চান না।
নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প স্বীকার করেন, ইরান যুদ্ধের প্রভাব ভোটে পড়েছে। তাঁর মতে, সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় ভোটারদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছিল। তবে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতে এই যুদ্ধ প্রয়োজন ছিল বলেও দাবি করেন তিনি। যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে কিছু করার সুযোগ থাকলেও তিনি ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতেন না বলে জানান।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে নিয়েও কথা বলেন ট্রাম্প। যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ এবং তাঁর বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরুর সম্ভাবনা থাকলেও হেগসেথকে দায়িত্ব থেকে সরানোর কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানান প্রেসিডেন্ট। তাঁর ভাষ্য, হেগসেথ ভালো কাজ করছেন।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স অবশ্য নির্বাচনে পরাজয়ের কারণ হিসেবে ইরান যুদ্ধকে আরও সরাসরি দায়ী করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘আমাদের পরাজয়ের কারণ যুদ্ধ।’ ভোটারদের সমর্থন ফিরে পেতে যুদ্ধের অবসান, জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি এবং ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
নতুন কংগ্রেসে দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বাস্থ্যসেবা খাতে ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাতিলের উদ্যোগ নিতে চান ডেমোক্র্যাটরা। বিশেষ করে সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা আইন ও মেডিকেইড কর্মসূচিতে করা কাটছাঁট প্রত্যাহারের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
এ ছাড়া ট্রাম্প প্রশাসন ও বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড তদন্তের প্রস্তুতি নিচ্ছেন ডেমোক্র্যাট নেতারা। হাকিম জেফরিস জানিয়েছেন, অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনতে চান তাঁরা। প্রতিনিধি পরিষদের নজরদারি কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য রবার্ট গার্সিয়া সংশ্লিষ্টদের আইনজীবী প্রস্তুত রাখার সতর্কবার্তা দিয়েছেন। সিনেটের অর্থ কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য রন ওয়াইডেনও তদন্তের প্রয়োজনে সমন জারির ইঙ্গিত দিয়েছেন।
নির্বাচনের ফলাফলে কংগ্রেসের দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে রিপাবলিকানরা। ফলে আগামী দুই বছর আইন প্রণয়ন, বাজেট ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় ট্রাম্প সরকারের সামনে নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে যাচ্ছে।