যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মিশিগান থেকে জয় পেয়ে ইতিহাস গড়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আব্দুল আল-সায়েদ। ৪২ বছর বয়সী এই রাজনীতিক দেশটির প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করে তিনি এই মাইলফলক অর্জন করেন।
নির্বাচনী প্রচারে শুরু থেকেই নানা ধরনের আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে আল-সায়েদকে। তাঁর ধর্মীয় পরিচয় ও অভিবাসী পারিবারিক পটভূমিকে কেন্দ্র করে রিপাবলিকান শিবিরের বিভিন্ন নেতা তাঁকে ‘জিহাদি’ ও ‘উগ্রপন্থী’ বলে আক্রমণ করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও একাধিকবার তাঁর বিরুদ্ধে বিতর্কিত মন্তব্য করেন। এমনকি আল-সায়েদ সিনেটর হলে তাঁর জন্য আলাদা মেটাল ডিটেক্টর বসাতে হবে বলেও মন্তব্য করেছিলেন ট্রাম্প।
রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সও প্রচারে আল-সায়েদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের প্রভাব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে তাঁকে রাজনীতিতে আনা হয়েছে—এমন দাবিও করেন তিনি। ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে বারবার প্রশ্ন ও সমালোচনার মুখে পড়লেও প্রচারে সংযত অবস্থান বজায় রাখেন আল-সায়েদ।
একাধিকবার তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, ক্ষমতায় গেলে মুসলিমদের প্রতি তিনি বিশেষভাবে সদয় থাকবেন কি না। জবাবে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, শ্বেতাঙ্গ রাজনীতিকদেরও কি একইভাবে জিজ্ঞাসা করা হয়, তাঁরা শুধু শ্বেতাঙ্গ নাগরিকদের প্রতিনিধিত্ব করবেন কি না? তাঁর এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দেয়।
আল-সায়েদ পেশায় চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার পাশাপাশি কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। পরে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন এবং ডেট্রয়েটের স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্বেও কাজ করেন। প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট হিসেবে পরিচিত এই রাজনীতিক নির্বাচনী প্রচারে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, ধনীদের ওপর বেশি কর আরোপ, নিত্যপণ্যের দাম কমানো এবং অভিবাসীদের অধিকার রক্ষার মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলনীতি এবং দেশটির সামরিক ব্যয়েরও সমালোচনা করেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, ইসরায়েলের পক্ষে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসননীতির বিরুদ্ধেও সরব ছিলেন তিনি। নিজেকে সমাজতন্ত্রী হিসেবে পরিচিত করার প্রবণতার সমালোচনা করে আল-সায়েদ বলেছেন, তিনি মূলত পুঁজিবাদের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পক্ষে।
নির্বাচনে তাঁর পাশে ছিলেন ডেমোক্র্যাট দলের একাধিক প্রভাবশালী নেতা। বার্নি স্যান্ডার্স, এলিজাবেথ ওয়ারেন, আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজ ও কমলা হ্যারিস তাঁর প্রতি সমর্থন জানান। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও তাঁর পক্ষে প্রচারে অংশ নেন।
জয়ের পর প্রতিক্রিয়ায় আল-সায়েদ বলেন, মিশিগানবাসী একসঙ্গে এই অর্জন সম্ভব করেছেন। নির্বাচিত সিনেটর হিসেবে সবার সামনে দাঁড়াতে পেরে তিনি গর্বিত ও সম্মানিত বোধ করছেন।
১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর মিশিগানে জন্ম নেওয়া আল-সায়েদের বাবা মোহাম্মদ আল-সায়েদ মিসর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করতে গিয়েছিলেন। তাঁর মা ফাতেন আল-কোমি পেশায় নার্স। শৈশবে মা-বাবার বিচ্ছেদের পর ডেট্রয়েটে বাবা ও সৎমায়ের কাছে বেড়ে ওঠেন তিনি। ব্যক্তিগত জীবন ও রাজনৈতিক পথচলার নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এবার যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে প্রথম মুসলিম প্রতিনিধি হিসেবে জায়গা করে নিলেন আল-সায়েদ।