রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে নতুন নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) মঙ্গলবার থেকে ই-রিকশার নিবন্ধন আবেদন ফরম বিক্রি শুরু করছে। অন্যদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও (ডিএনসিসি) নিবন্ধন কার্যক্রম চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশার নিবন্ধন নিতে পারবেন। তবে শুধু আবেদন করলেই নিবন্ধন পাওয়া যাবে না। রিকশার কারিগরি মান, নিরাপত্তা ও ফিটনেস যাচাইয়ে নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে হবে।

গত বৃহস্পতিবার স্থানীয় সরকার বিভাগ ‘সিটি করপোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) চলাচল বিধিমালা, ২০২৬’ জারি করে। এই বিধিমালার আওতায় নিবন্ধন কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

আবেদন করবেন যাঁরা

বিধিমালা অনুযায়ী, আবেদনকারীকে বাংলাদেশের নাগরিক এবং কমপক্ষে ১৮ বছর বয়সী হতে হবে। একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশার নিবন্ধন নেওয়া যাবে। এই সীমা সব সিটি করপোরেশন মিলিয়ে প্রযোজ্য। অর্থাৎ একাধিক সিটি করপোরেশনে আবেদন করলেও পাঁচটির বেশি রিকশার নিবন্ধন পাওয়া যাবে না।

এ ছাড়া এক সিটি করপোরেশনে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় চলাচল করতে পারবে না।

কোথায় মিলবে আবেদন ফরম

ডিএসসিসির নগর ভবন ও সব আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে ১০০ টাকা দিয়ে আবেদন ফরম সংগ্রহ করা যাবে। ডিএনসিসি ফরম ছাপানোর কাজ করছে। সংস্থাটি শিগগিরই ফরম বিক্রির তারিখ জানাবে।

নিবন্ধনে যেসব কাগজ লাগবে

আবেদনের সঙ্গে জমা দিতে হবে জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত অনুলিপি, দুই কপি ছবি, নির্ধারিত ফি জমার রসিদ এবং রিকশার ফিটনেস সনদ।

আবেদন পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রিকশার কারিগরি মান ও নিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাই করবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নির্ধারিত নকশা ও প্রযুক্তিগত মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে। সব শর্ত পূরণ হলে আবেদন পাওয়ার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নিবন্ধন দেওয়ার বিধান রয়েছে।

পুরোনো রিকশা বাতিল করে নতুন রিকশা কেনা বাধ্যতামূলক নয়। অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এবং ফিটনেস সনদ নিশ্চিত করতে পারলে পুরোনো রিকশাও নিবন্ধনের সুযোগ পাবে।

নিবন্ধন ও নবায়ন ফি কত

বিধিমালায় যাত্রী ধারণক্ষমতা অনুযায়ী নিবন্ধন ও নবায়ন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। দুই যাত্রীর ই-রিকশার নিবন্ধন ফি আট হাজার টাকা এবং চার যাত্রীর ক্ষেত্রে ১০ হাজার টাকা। বার্ষিক নবায়ন ফি যথাক্রমে চার হাজার ও পাঁচ হাজার টাকা। ফিটনেস সনদের জন্য দিতে হবে এক হাজার টাকা।

নিবন্ধনের মেয়াদ পাঁচ বছর। তবে একটি ই-রিকশার সর্বোচ্চ আয়ুষ্কাল নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ বছর। প্রতিটি নিবন্ধিত রিকশায় কিউআর কোডযুক্ত নম্বরপ্লেট থাকবে।

চলাচলে যেসব বিধিনিষেধ

নতুন নিয়মে ঢাকাকে আটটি অঞ্চলে ভাগ করা হবে। প্রতিটি অঞ্চলের ই-রিকশার রং হবে আলাদা। এক অঞ্চলে নিবন্ধিত রিকশা অন্য অঞ্চলে চলতে পারবে না।

ই-রিকশার সর্বোচ্চ গতিসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার। স্কুল, হাসপাতাল ও ব্যস্ত এলাকায় এই সীমা হবে ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটার। মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে ও নিষিদ্ধ সড়কে এসব যান চলাচল করতে পারবে না।

চার্জিং স্টেশন পরিচালনার জন্যও আলাদা নিবন্ধন নিতে হবে। পাশাপাশি পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র থাকা বাধ্যতামূলক। অতিরিক্ত যাত্রী বহন, অনুমোদনহীন ব্যাটারি ব্যবহার এবং অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

নতুন নকশায় বাড়ছে নিরাপত্তাব্যবস্থা

বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. এহসানের নেতৃত্বে একটি গবেষক দল ই-রিকশার নতুন নকশা তৈরি করেছে। এতে হাইড্রোলিক ডিস্ক ব্রেক, বিকল্প পার্কিং ব্রেক, পেছনের যান দেখার আয়না, সংকেতবাতি ও স্থায়ী হেডলাইটসহ ১৬টি নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্য যুক্ত করা হয়েছে।

নতুন নকশায় একটি রিকশা তৈরি করতে খরচ হতে পারে প্রায় দেড় লাখ টাকা। এর সঙ্গে ব্যাটারির জন্য বাড়তি ৫০ হাজার থেকে এক লাখ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। ফলে নতুন মানদণ্ড অনুযায়ী রিকশা তৈরি বা পরিবর্তন করতে মালিকদের উল্লেখযোগ্য অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে।

নতুন বিধিমালার মাধ্যমে রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং যানবাহন ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে নিবন্ধনপ্রক্রিয়া সহজ রাখা এবং সড়কে নিয়মের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করাই হবে এই উদ্যোগের বড় পরীক্ষা।