বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মরদেহ উদ্ধারের তিন দিন পেরিয়ে গেলেও এ ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি। পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করার আগ্রহ না থাকায় তদন্তের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। পুলিশের একাধিক অনুরোধের পরও এখন পর্যন্ত মামলা করতে রাজি হয়নি তাহসিফের পরিবার।
তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম জানিয়েছেন, মামলা করার বিষয়ে তাঁরা পরে সিদ্ধান্ত নেবেন। তাঁর প্রত্যাশা, রাষ্ট্র নিজ উদ্যোগেই ছেলের মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটনে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, ‘মামলার বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত নেব। মামলার কেন প্রয়োজন হবে? সরকার নিশ্চয়ই এ বিষয়ে দায়িত্ববোধের পরিচয় দেবে এবং অত্যন্ত আন্তরিক হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। মামলা মানেই আমাদের দেশে একটা ঝামেলা, কোর্টে দৌড়াদৌড়ি। কে চায় এরকম ঝামেলার মধ্যে পড়তে?’
পরিবার মামলা না করলে পুলিশের করণীয় কী হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) অতিরিক্ত ডিআইজি এনায়েত হোসেন মান্নান জানিয়েছেন, নৌ পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করায় তারা অপমৃত্যুর মামলা করতে পারে।
তবে নৌ পুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিনের বক্তব্য, মরদেহ উদ্ধার করা হলেও ঘটনাস্থল উত্তরখান থানা এলাকায় হওয়ায় বিষয়টি দেখবে সংশ্লিষ্ট থানা। উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন, এখনো কোনো মামলা হয়নি। পরিবারের সদস্যদের একাধিকবার মামলা করতে বলা হলেও কেউ থানায় আসেননি। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আইন অনুযায়ী, কোনো আমলযোগ্য অপরাধের বিষয়ে শুধু নিহত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যরাই নন, তৃতীয় ব্যক্তি, প্রতিবেশী কিংবা প্রত্যক্ষদর্শীও থানায় অভিযোগ করতে পারেন। পরিবার মামলা না করলেও পুলিশ নিজ উদ্যোগে মামলা করতে পারে বলে জানিয়েছেন পিবিআইয়ের এই কর্মকর্তা।
এদিকে, তাহসিফের বন্ধু স্থানীয় ছোট ভাই আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দ্বীপকে শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) মধ্যরাতে পিবিআইয়ের হেফাজত থেকে নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ঘটনার দিন তাহসিফের সঙ্গে নিজের অবস্থান নিয়ে সংবাদমাধ্যমে এক ধরনের বক্তব্য দিলেও পরে পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে ভিন্ন তথ্য দেন তিনি। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, দ্বীপের বক্তব্যে ঘটনার কিছু তথ্য আড়াল করার চেষ্টা থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি তদন্ত সংস্থা।
এর আগে দ্বীপ জানিয়েছিলেন, রাতে একটি রেস্তোরাঁয় একসঙ্গে খাবার খাওয়ার পর উত্তরা হাউজবিল্ডিং এলাকায় তাহসিফের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান তিনি। তবে ওই রাতেই মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বাসা থেকে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পিবিআই। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুক্রবার সকালে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।
পরে দ্বীপ স্বীকার করেন, ঘটনার রাতে তাহসিফের সঙ্গে টঙ্গীর ওই এলাকায় গিয়েছিলেন তিনি। এলাকাটি মাদক স্পট হিসেবে পরিচিত। পিবিআইয়ের এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার গভীর রাতে সেখানে অবস্থানের সময় পুলিশের একটি দল তাঁদের ধাওয়া করে। তখন দ্বীপ তুরাগ তীরে বিআইডব্লিউটিএর ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের পেছনে লুকান। তাহসিফ নদে ঝাঁপ দেন বলে দ্বীপের দেওয়া তথ্যের বরাতে জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা। পরে দ্বীপ সেখান থেকে চলে যান এবং রাত আড়াইটার দিকে বাসায় ফেরেন।
তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার পেছনের পরিস্থিতি এখনো তদন্তসাপেক্ষ। পরিবার মামলা না করায় তদন্ত কোন পথে এগোবে, তা নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট পুলিশ ইউনিটগুলোর পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।