বাংলাদেশের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে একটি বড় শিল্প ও বাণিজ্যিক অঞ্চল গড়ে তুলতে চায় জাপান। এই পরিকল্পনার নাম ‘বিগ-বি’—বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ ইনিশিয়েটিভ। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সাম্প্রতিক বৈঠকের পর দুই দেশের যৌথ ঘোষণায় উদ্যোগটি নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে এই পরিকল্পনায় ভারতকে যুক্ত করার জাপানি আগ্রহও আলোচনায় এসেছে।

বিগ-বি উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো, শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ শক্তিশালী করা। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবহন, শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তির অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনা রয়েছে এতে।

মাতারবাড়ী কেন গুরুত্বপূর্ণ?

কক্সবাজারের মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে গভীর সমুদ্রবন্দর ও শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে জাপান প্রায় এক দশক ধরে কাজ করছে। এ উদ্যোগের আওতায় শুধু বন্দর নির্মাণ নয়, পণ্য পরিবহন, সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোর উন্নয়নকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপান স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলমের মতে, মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে একটি বড় ব্যবসায়িক কেন্দ্র গড়ে তোলাই বিগ-বির মূল লক্ষ্য। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক সংযোগস্থল হিসেবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বিগ-বি ধারণার সূত্রপাত ২০১৪ সালে। ওই বছরের মে মাসে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফরের সময় দেশটির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে উদ্যোগটি সামনে আনেন। পরে ২০১৪ সালের জুনে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা—জাইকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আকিহিকো তানাকা ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে এর মূল ধারণা ব্যাখ্যা করেন।

তখন গভীর সমুদ্রবন্দর, জ্বালানি এবং পরিবহনব্যবস্থাকে এই পরিকল্পনার তিনটি প্রধান ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে উদ্যোগটি ঘিরে আঞ্চলিক বাজার সম্প্রসারণ ও শিল্পায়নের ধারণাও গুরুত্ব পায়।

বিগ-বিতে ভারতকে যুক্ত করতে চায় কেন জাপান?

বিগ-বির প্রাথমিক পরিকল্পনায় বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারকে বৃহত্তর বাজারের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। জাপানের দৃষ্টিতে, এসব অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ও বাণিজ্য বাড়াতে পারলে মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শিল্পাঞ্চলের অর্থনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়বে।

অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলমের মতে, ভারতকে যুক্ত করার ক্ষেত্রে দেশটির বিশাল বাজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশের মাতারবাড়ী বন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক অবকাঠামো ভারতসহ আশপাশের দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তবে এই উদ্যোগের সঙ্গে ভূরাজনৈতিক বিবেচনাও জড়িত বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ও গবেষক ড. গোলাম মোয়াজ্জেম। তাঁর মতে, বঙ্গোপসাগর ও বৃহত্তর প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অর্থনৈতিক উপস্থিতি বাড়ানো এবং জাপানি বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও বিগ-বির গুরুত্বের অংশ।

চীনসহ বড় শক্তিগুলোর প্রভাবের প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগের কৌশলগত তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা রয়েছে। তবে বিগ-বিতে ভারতের অংশগ্রহণের বিষয়ে জাপানের আগ্রহকে শুধু ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখার পরিবর্তে বাণিজ্য, বাজার ও বিনিয়োগের বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

যৌথ ঘোষণায় কী গুরুত্ব পেয়েছে?

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফর শেষে প্রকাশিত যৌথ ঘোষণায় দুই দেশ ‘অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য বিগ-বি’ উদ্যোগকে নতুন পর্যায়ে উন্নীত করতে একমত হয়েছে। এতে মাতারবাড়ী-মহেশখালী এলাকাকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প ও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি অবকাঠামোর সমন্বিত কেন্দ্রে পরিণত করার কথা বলা হয়েছে।

উদ্যোগটির আওতায় শিল্পের মূল্য সংযোজন শৃঙ্খল গড়ে তোলা, বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থার প্রবেশদ্বার হিসেবে অঞ্চলটির বিকাশ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।

যৌথ ঘোষণায় আরও চারটি ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা জোরদার করা।

মাতারবাড়ী বন্দরকে জাতীয় মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত করতে ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সংযোগ সড়ক নির্মাণ এবং চট্টগ্রাম থেকে চকরিয়া পর্যন্ত বিদ্যমান মহাসড়ক উন্নয়নেও জাইকা সহায়তা করছে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে মাতারবাড়ী বন্দর প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের চুক্তি হয়।

বাংলাদেশের জন্য সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ

বিগ-বি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে শিল্প বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, পণ্য পরিবহন ও রপ্তানি কার্যক্রম সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। আঞ্চলিক বাজারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়লে মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে নতুন শিল্প ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও রয়েছে।

তবে এ ধরনের বড় অবকাঠামো ও শিল্পায়ন পরিকল্পনায় বিনিয়োগের শর্ত, পরিবেশগত প্রভাব, জ্বালানি ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় এবং বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক চাহিদা বিবেচনায় রাখা জরুরি। বিশেষ করে কয়লা ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্পাঞ্চলের ধরন নির্ধারণে দীর্ঘমেয়াদি সুফল ও ঝুঁকি পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে, বিগ-বি বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি বন্দর বা শিল্পাঞ্চল নির্মাণের পরিকল্পনা নয়; এটি বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে আঞ্চলিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও যোগাযোগব্যবস্থা সম্প্রসারণের একটি বৃহত্তর উদ্যোগ। এতে ভারতকে কীভাবে যুক্ত করা হবে এবং বাংলাদেশ কীভাবে নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থ নিশ্চিত করবে, তা-ই হবে পরিকল্পনাটির ভবিষ্যৎ অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।