নগদবিহীন বাংলাদেশ গড়ার পথে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঐতিহাসিক পদক্ষেপ; খুচরা টাকা ও ভাংতি ঝামেলা এড়াতে পিটুপি ডিজিটাল লেনদেনে সম্পূর্ণ মাশুল ছাড়।

ঢাকা: কাগুজে মুদ্রা বা নগদ টাকাবিহীন আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বজনীন পেমেন্ট ব্যবস্থা ‘বাংলা কিউআর’-এর চতুর্থ ধাপের আনুষ্ঠানিক প্রসারের মাধ্যমে আগামী ১লা নভেম্বর (২০২৬) থেকে দেশজুড়ে শুরু হতে যাচ্ছে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি (পিটুপি) ডিজিটাল লেনদেনের নতুন যুগ। এর ফলে দেশের অনানুষ্ঠানিক ও প্রান্তিক খাতের ক্ষুদ্র লেনদেনে কাগুজে নোটের ব্যবহার অনেকটাই উঠে যাবে।

আজ সোমবার (১২ই অক্টোবর ২০২৬) জাতীয় বার্তা সংস্থা বাসস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন এই ব্যবস্থার আওতায় লেনদেনের জন্য কোনো বাণিজ্যিক মার্চেন্ট অ্যাকাউন্টের প্রয়োজন হবে না। সাধারণ রিকশাচালক, বাস কন্ডাক্টর, ফুটপাতের হকার, সবজি বিক্রেতা, টং দোকানের চা-বিক্রেতা এমনকি ভিক্ষুক বা সাহায্যপ্রার্থীরাও নিজেদের ব্যক্তিগত কিউআর কোডের মাধ্যমে স্মার্টফোন অ্যাপ দিয়ে সরাসরি টাকা আদান-প্রদান করতে পারবেন।

দেশীয় প্রযুক্তিতে আন্তর্জাতিক ‘ইএমভি স্ট্যান্ডার্ড’ মেনে তৈরি বাংলা কিউআরের এই উন্মুক্ত ও সহজ মডেলটি বৈশ্বিক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। গুগল, মেটা ও হুয়াওয়ের মতো বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যে বাংলা কিউআরের এই ওপেন-মডেল নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

বাংলা কিউআর চতুর্থ ধাপের মূল সুবিধা ও বৈশিষ্ট্যসমূহ:

  • ভাংতির অভাব ও ছেঁড়া নোটের চিরতরে অবসান: দৈনন্দিন কেনাকাটায় ২ বা ৩ টাকার ভাংতি বা খুচরা টাকা না থাকার বিড়ম্বনা দূর হবে। বিল যদি ২৩ টাকা বা ৪৭ টাকাও হয়, গ্রাহক কিউআর কোড স্ক্যান করে অ্যাপের মাধ্যমে ঠিক ওই নিখুঁত অঙ্কটাই পরিশোধ করতে পারবেন।
  • ডিজিটাল দান ও ভিক্ষা: সামাজিক বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অনুদান কিংবা সাহায্যপ্রার্থীদের এখন থেকে সরাসরি ব্যক্তিগত মোবাইল আর্থিক সেবার (এমএফএস) বাংলা কিউআর স্ক্যান করে ২, ৫ বা ১০ টাকার মতো ছোট অঙ্কও নিরাপদে পাঠানো যাবে। তবে এই ব্যক্তিগত কোড দিয়ে ক্যাশআউটের বেআইনি চেষ্টা করা হলে অ্যাকাউন্ট বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
  • জিরো চার্জ বা সম্পূর্ণ ফ্রি লেনদেন: ডিজিটাল লেনদেনে অতিরিক্ত মাশুলের ভীতি দূর করতে বাংলাদেশ ব্যাংক একে সম্পূর্ণ মাশুলমুক্ত (০% সার্ভিস চার্জ) করেছে। গ্রাহক বা বিক্রেতা—কারো অ্যাকাউন্ট থেকেই কোনো অতিরিক্ত চার্জ কাটা হবে না।
  • সীমাহীন লেনদেনের সুবিধা: ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রে আগের দৈনিক ২০ হাজার টাকার লেনদেন সীমা তুলে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ইন্টারনেটের গতি বা স্ক্যানিংয়ের সুবিধা বাড়াতে দূর থেকে কিউআর কোডের ছবি বা স্ক্রিনশট গ্যালারি থেকে আপলোড করে লেনদেন সম্পন্ন করার সুবিধাও যুক্ত করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে যেখানে দেশে বাংলা কিউআরে দৈনিক গড় লেনদেন ছিল ৩৭ কোটি টাকা, সেপ্টেম্বর শেষে তা চার গুণেরও বেশি বেড়ে প্রতিদিন গড়ে ১৪৩ কোটি থেকে ১৮০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৪০ লাখ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বাংলা কিউআর চালু রয়েছে। ১ নভেম্বর সর্বস্তরের অংশগ্রহণের পর দৈনিক এই লেনদেনকে খুব দ্রুত ৩ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।