জুয়ার নেশার অর্থ জোগাতে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে একসঙ্গে ১৪ জন পুরুষকে বিয়ে এবং প্রতারণার মাধ্যমে লাখ লাখ ডলার হাতিয়ে নেওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের জুয়ার স্বর্গরাজ্য লাস ভেগাসে। এই অভিনব প্রতারণার অভিযোগে অভিযুক্ত ৩৩ বছর বয়সী জিয়াইং চেন নামের এক নারী অবশেষে আদালতে নিজের দোষ স্বীকার করেছেন। তবে প্রসিকিউশনের সাথে বিশেষ সমঝোতার কারণে তাঁর কারাদণ্ডের পরিবর্তে প্রবেশন (পর্যবেক্ষণাধীন মুক্তি) পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

অভিযুক্ত জিয়াইং চেনকে ২০২৪ সালে গ্রেপ্তার করে মার্কিন পুলিশ। দীর্ঘ তদন্তের পর বেরিয়ে আসে তাঁর এই অবিশ্বাস্য বহুবিবাহ ও প্রতারণার রোমহর্ষক কাহিনী।

‘ভিকি লিয়াং’ সেজে একের পর এক প্রেম ও বিয়ের ফাঁদ

তদন্তে জানা যায়, ২০১৯ সালের মার্চ থেকে নেভাদা অঙ্গরাজ্যের ক্লার্ক কাউন্টিতে জিয়াইং চেন মোট ১৪টি বিয়ের সনদ (ম্যারেজ সার্টিফিকেট) সংগ্রহ করেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ‘ভিকি লিয়াং’ নামের একটি ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন পুরুষের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলতেন এবং অত্যন্ত দ্রুত সময়ের মধ্যে তাঁদের বিয়ের ফাঁদে ফেলতেন। লাস ভেগাসে বিয়ের আইনি প্রক্রিয়া তুলনামূলক সহজ হওয়ার সুযোগটিকেই তিনি তাঁর প্রতারণার মূল হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেন।

অসুস্থতার কথা বলে লাখো ডলার লোপাট ও জুয়া খেলা

প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, বিয়ের পরপরই চেন তাঁর নতুন স্বামীদের কাছে দাবি করতেন যে, চীনে থাকা তাঁর অসুস্থ স্বজনদের জরুরি চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা প্রয়োজন। এই আবেগঘন ও ভুয়া অজুহাতে তিনি স্বামীদের কাছ থেকে সম্মিলিতভাবে ১ লাখ মার্কিন ডলারের (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকারও বেশি) বেশি অর্থ হাতিয়ে নেন।

তবে তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, স্বজনদের চিকিৎসার কথা বলা হলেও ওই বিপুল অর্থ আসলে লাস ভেগাস স্ট্রিপের অত্যন্ত বিলাসবহুল ‘উইন ক্যাসিনো’তে জুয়া খেলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পুলিশের তথ্যমতে, শুধু বিগত এক বছরেই চেন ক্যাসিনোতে জুয়া খেলতে গিয়ে ৩ লাখ ডলারেরও বেশি অর্থ হারিয়েছেন।

যেভাবে চলত প্রতারণা

তদন্তে জানা গেছে, পরিচয় হওয়ার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই চেন পুরুষদের বিয়ের প্রস্তাব দিতেন। বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়ে তিনি ভুক্তভোগী স্বামীদের সাথে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিতেন।

এক ভুক্তভোগী স্বামী দাবি করেন, চীনে অসুস্থ আত্মীয়ের চিকিৎসার কথা বলে তাঁর কাছ থেকে ৪০ হাজার ডলার নেওয়ার পরেই চেন তাঁকে জানিয়ে দেন যে তিনি আর এই বৈবাহিক সম্পর্ক রাখতে চান না। পরবর্তীতে জিজ্ঞাসাবাদে চেন পুলিশের কাছে স্বীকার করেন যে, একটি ভুয়া বিয়ে থেকে তিনি সর্বোচ্চ ২০ হাজার ডলার পর্যন্ত আয় করতে পারতেন।

আদালতে দোষ স্বীকার ও সম্ভাব্য সাজা

গত ৯ জুলাই আদালতে বহুবিবাহ এবং প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন চেন। তবে প্রসিকিউশনের সাথে একটি বিশেষ সমঝোতার (Plea Deal) কারণে তাঁর বিরুদ্ধে আনা আরও কয়েকটি গুরুতর অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিতে সম্মত হয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। পাশাপাশি আদালতে তাঁর জন্য কঠোর জেলের পরিবর্তে প্রবেশনের সুপারিশ করা হবে।

আইন অনুযায়ী নেভাদায় বহুবিবাহের অপরাধে ১ থেকে ৪ বছর এবং প্রতারণার অভিযোগে ১ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে প্রসিকিউশনের এই সমঝোতার ফলে আগামী ২০ আগস্ট নির্ধারিত সাজা ঘোষণার দিনে তিনি হয়তো অল্প মেয়াদে কারাভোগ বা কোনো কারাদণ্ড ছাড়াই কেবল প্রবেশন সুবিধায় মুক্তি পেয়ে যেতে পারেন। এই অবিশ্বাস্য প্রতারণার ঘটনাটি বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।