স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর ও ঐতিহাসিক দাবি করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগ নেতা তাজউদ্দীন আহমদের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি, কারণ তাঁর পাকিস্তান ভাঙার কোনো ইচ্ছা ছিল না। আজ শনিবার (১১ জুলাই) মহাখালীর ‘রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (রাওয়া)’ মিলনায়তনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
‘দি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে ইতিহাস ঐতিহ্য এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়’ শীর্ষক এই আলোচনা সভায় মহান মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা এবং স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে নানা রাজনৈতিক বিতর্কিত বিষয়ের অবতারণা করেন তিনি।
তাজউদ্দীনের অনুরোধ ও শেখ মুজিবের অনীহা
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ তাঁর বক্তব্যে ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, “তাজউদ্দীন সাহেব শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে গিয়ে বলেছিলেন, পাকিস্তানিরা আমাদের ওপর আক্রমণ করতে যাচ্ছে, এ দেশের সাধারণ মানুষ এখন স্বাধীনতা চায়। কিন্তু শেখ সাহেব তখন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, আমি বিচ্ছিন্নতাবাদী হতে পারি না। পাকিস্তান ভাঙতে আমার কোনো অবদান থাকুক, এটি আমি চাই না। সুতরাং তিনি শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি।”
তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরোচিত ও অতর্কিত আক্রমণের মুখে যখন বাঙালি জাতি সম্পূর্ণ দিশেহারা ও অবদমিত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, ঠিক তখনই ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সাহসের সাথে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই চরম সংকটময় ও ঐতিহাসিক মুহূর্তে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, যা দিশেহারা জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্দীপ্ত ও অনুপ্রাণিত করেছিল। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “এটিই হলো প্রকৃত সত্য।”
ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ
মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ অভিযোগ করেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ কোনো নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক দলের যুদ্ধ ছিল না, এটি ছিল মূলত এ দেশের সর্বস্তরের জনতার যুদ্ধ। কিন্তু স্বাধীনতার পর ক্ষমতায় এসে একটি বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠী ইতিহাস বিকৃত করার অপচেষ্টা চালায়।
তিনি বলেন, “স্বাধীনতার পর একটি বিশেষ গোষ্ঠী শুধু ৭ই মার্চের ভাষণের ওপর ভিত্তি করে পুরো স্বাধীনতার একক কৃতিত্ব নিতে চেয়েছিল, যা ছিল চরম অন্যায়। রাজনীতিবিদরা সাধারণত অন্যের কৃতিত্ব হাইজ্যাক করেন এবং নিজের দলের নেতাকে ছাড়া অন্য কাউকে কোনো কৃতিত্ব দিতে চান না।”
ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বীরত্ব ও ব্যক্তিগত স্মৃতি
আলোচনায় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের গৌরবময় ভূমিকার কথা স্মরণ করে স্পিকার বলেন, ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে রেজিমেন্টের মাত্র পাঁচটি ব্যাটালিয়ন ছিল। একেকটি ক্যান্টনমেন্টে তারা কোনো পূর্বপরিকল্পনা বা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ ছাড়াই পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরোচিত গণহত্যার প্রতিবাদে তাৎক্ষণিক বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং জনগণকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের আহ্বান জানায়। এই সামরিক প্রতিরোধ যুদ্ধই ছিল ৯ মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মূল ভিত্তি।
নিজের সেনাবাহিনীতে যোগদানের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে তিনি জানান, তিনি মূলত ফুটবল খেলার টানেই সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের অনুপ্রেরণাতেই তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি গভীর শ্রদ্ধার সাথে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমানকে স্মরণ করেন। এর পাশাপাশি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রধান সংগঠক মেজর আব্দুল গনি এবং ১৯৭১ সালে চট্টগ্রামের রেজিমেন্ট কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার মাহমুদুর রহমান মজুমদারের অবদানের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করে অফিসার ও সৈনিকদের পারস্পরিক বন্ধন আরও জোরদার করার আহ্বান জানান।