বাংলাদেশের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার এখনো বন্ধ রয়েছে। দুই দেশের সরকারপ্রধান পর্যায় থেকে শুরু করে উপদেষ্টা ও মন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দফায় দফায় দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ও সফরের পরও শ্রমবাজারটি খোলার বিষয়ে আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি। আসেনি কোনো সফলতা। এক্ষেত্রে সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা ও ঢালাও মামলার প্রভাবকে দায়ী করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব মামলার কারণে শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে নতুন সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এতে মালয়েশিয়ায় নতুন করে ৫ লাখ শ্রমিক পাঠানো অনিশ্চিয়তা দেখা দিয়েছে।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো সূত্র জানায়, বাংলাদেশের জন্য সৌদি আরবের পরেই দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার মালয়েশিয়া।  ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের ৩১ মে পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ৪ লাখ ৮০ হাজার শ্রমিক মালয়েশিয়ায় পাঠানো হয়। গত বছরের ৩১ মে থেকে বাংলাদেশসহ ১৫টি সোর্স কান্ট্রি থেকে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক নেওয়া বন্ধ ছিল।

কিন্তু গত জানুয়ারি মাস থেকে ইন্দোনেশিয়া, নেপালসহ অন্যান্য সোর্স কান্ট্রি থেকে শ্রমিক নিতে থাকে মালয়েশিয়া। চলতি বছর ইন্দোনেশিয়া ও নেপাল থেকে ইতিমধ্যে ৪১ হাজার ৩৭৩ জন শ্রমিক নিয়েছে দেশটি। এই দুটি দেশ থেকে আরও ৫০ হাজার শ্রমিক আগামী জানুয়ারি মাসে নেওয়ার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। গত এক বছরে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক গেছে মাত্র ২৯০ জন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নেপাল ২১ হাজার ১৮৩ জন ও ইন্দোনেশিয়া ২৯ হাজার ৯০০ শ্রমিক পাঠিয়েছে। গত নভেম্বর মাসে ইন্দোনেশিয়া ২ হাজার ৫৬১ জন ও নেপাল ৫ হাজার ৭৭৩ জন শ্রমিক পাঠিয়েছে। তার তুলনায় বাংলাদেশ থেকে গেছে মাত্র ৯০ জন।

এছাড়াও বাংলাদেশ বাদে অপর ১৪ সোর্স কান্ট্রিগুলোর ২০২৫ সালে ১ লাখ ১৩ হাজার ২২২ জন শ্রমিক পাঠাতে নিবন্ধন করেছে। এর মধ্যে নেপাল ৬০ হাজার, ইন্দোনেশিয়া ২২ হাজার ৬৮৫, ভারত ১২ হাজার ২৭ জন, পাকিস্তান ৭ হাজার ৪২৮ জন, ফিলিপাইন ৬ হাজার ২০৪ জন, মিয়ানমার ১ হাজার ৩৬০ জন, থাইল্যান্ড ৬০৮ জন, শ্রীলঙ্কা ৩৭৭ জন ও ভিয়েতনাম ৯২ জন। আর বাংলাদেশ থেকে চলতি বছর নিবন্ধন হয়েছে ১ হাজার ৮৫৩ জন।

২০২৪ সালের ৩১ মে পর্যন্ত কলিং ভিসা, নিয়োগানুমতি, বিএমইটির ছাড়পত্রসহ যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরও প্রায় ১৮ হাজার শ্রমিক মালয়েশিয়া যেতে পারেনি। গত বছরের ৪ অক্টোবর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বাংলাদেশ সফরের সময় বিষয়টি উত্থাপন করা হলে তিনি এসব শ্রমিককে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল দুই বার মালয়েশিয়া সফর করেন। এছাড়াও কয়েক দফায় যৌথ ওয়ার্কিং কমিটির সভা হয়েছে। কিন্তু শ্রমবাজার খোলার কোনো ধরনের সুফল আসেনি।

গত বছরের মে মাসে আটকে পড়া শ্রমিকদের মালয়েশিয়া পাঠানোর দায়িত্ব দেওয়া হয় রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ ওভারসিস এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডকে (বোয়েসেল)। সরকারি প্রতিষ্ঠানটি এসব শ্রমিক পাঠাতে ব্যর্থ হয়েছে। শুরুতে বোয়েসেলকে ২০২৪ সালে আটকা পড়া ৭ হাজার ৮৬৯ জন শ্রমিক পাঠানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। গত জুলাই থেকে নির্ধারিত সময়ের প্রায় ছয় মাস হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত মাত্রা ১৫০ জন শ্রমিক পাঠানো গেছে।

জনশক্তি রপ্তানি সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মে মাস পর্যন্ত মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে জিটুজি প্লাস চুক্তি অনুযায়ী ৪ লাখ ৮০ হাজার শ্রমিক পাঠানো হয়। এই শ্রমিক পাঠাতে অর্থ পাচারের অভিযোগে বেশ কয়েকটি মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এসব মামলায় সরাসরি অর্থ ও মানব পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার সঠিক তদন্ত না হওয়ায় এরই মধ্যে মালয়েশিয়া সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে এসব ‘অপ্রমাণিত’ অভিযোগ প্রত্যাহার না করা হলে তারা বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেবে না।

জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার সিনিয়র সদস্য মোবারক উল্লাহ শিমুল বলেন, আমরা যখন লোক পাঠাই তখন ভিসা ট্রেড করায় আমাদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং ও মানব পাচারের অভিযোগে সিআইডি এবং দুদক মামলা করেছে। এখন সরকারি সংস্থাও একই কাজ করছে। তাদের বিরুদ্ধে সরকারি সংস্থাও এখন মানব পাচার ও অর্থ পাচারের মামলা করছে। এসব মামলার কারণে শ্রমিক গ্রহণকারী দেশ হিসেবে মালয়েশিয়ার মানব পাচার সূচক কমছে। তারা বলছে শুধু বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নিলে মানব পাচার মামলা হয়। যারা মামলা করছে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিলে আগামী দিনগুলোতে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার  স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অভিবাসন ও দক্ষতা উন্নয়ন শাখার একজন কর্মকর্তা বলেন, বিগত সময়ে বেশ কিছু রিক্রুটিং এজেন্সি সিন্ডিকেট করে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠিয়েছিল। তাদের বিরুদ্ধে হুন্ডিতে কয়েক শ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঐসব সিন্ডিকেটকে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর কাজটি না দিতে মন্ত্রণালয় থেকে মৌখিক নির্দেশনা রয়েছে। নতুন করে যেসব রিক্রুটিং এজেন্সি, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ অপেক্ষাকৃত কম, তাদেরকে দিয়ে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে ইতিমধ্যে নতুন করে রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা করা হচ্ছে।

বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ে ইউনিভার্সিটি অব পূত্রামালয়েশিয়ার গবেষক সৈয়দ কামরুল ইসলাম বলেন, গত বছরের মে মাসে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক নেওয়া বন্ধ হওয়ার পর বাংলাদেশ সরকার নতুন করে শ্রমিক পাঠানোর লক্ষ্যে বাজার খুলতে পারেনি। এ সুযোগ নেপাল, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দখল করে নিচ্ছে।